জাতিসংঘ সনদে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ‘শত্রু রাষ্ট্র’–সংক্রান্ত বিধান এখনও বহাল থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে চীন ও জাপানের মধ্যে নতুন করে মতপার্থক্য প্রকাশ পেয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে জাপানের বক্তব্যের জবাবে চীন বলেছে, ওই ধারাগুলোর বর্তমান সময়েও বাস্তব তাৎপর্য রয়েছে। ফলে সেগুলো বাদ দেওয়া বা পরিবর্তনের উদ্যোগকে বেইজিং সমর্থন করে না। অন্যদিকে জাপান দীর্ঘদিন ধরে এসব উল্লেখ সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান জানিয়ে আসছে।
২৮ সেপ্টেম্বরের অধিবেশনে জাপানের বক্তব্যের জবাবে পাল্টা বক্তব্য দেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করে চীনের পক্ষ থেকে এ অবস্থান তুলে ধরা হয়। জাতিসংঘে চীনের স্থায়ী উপপ্রতিনিধি সুন লেই বলেন, জাপান ২২ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যে নিজেকে শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে এবং আত্মরক্ষার নীতি অনুসরণের কথা বলেছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের ‘শত্রু রাষ্ট্র’–সংক্রান্ত ধারাগুলো বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। চীন এ দাবির বিরোধিতা করেছে।
চীনের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস এবং যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রশ্ন। সুন লেইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিকতাবাদী অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে নতুন অবস্থান তৈরি করেছিল। চীনের দাবি, সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে শুধু বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে জাতিসংঘ সনদের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে দেখলে যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত হবে।
জাতিসংঘ সনদের ৫৩ অনুচ্ছেদে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ বলতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সনদের কোনো স্বাক্ষরকারী দেশের বিরুদ্ধে শত্রুতায় থাকা রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়েছে। ১০৭ অনুচ্ছেদেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার শত্রু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ব্যবস্থা সম্পর্কে বিধান রয়েছে। ৭৭ অনুচ্ছেদে ট্রাস্টিশিপ ব্যবস্থার আওতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে—এমন ভূখণ্ডের উল্লেখ রয়েছে।
তবে এসব বিধান নিয়ে জাতিসংঘে নতুন আলোচনা হচ্ছে—এমন নয়। বহু বছর ধরেই এগুলোকে পুরোনো বা সময়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বাদ দেওয়ার আলোচনা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে সাধারণ পরিষদ ৫০/৫২ নম্বর প্রস্তাবে ৫৩, ৭৭ ও ১০৭ অনুচ্ছেদ থেকে ‘শত্রু রাষ্ট্র’–সংক্রান্ত উল্লেখ বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার অভিপ্রায় জানিয়েছিল। সেই সময় এ বিষয়ে ১৫৫টি দেশ পক্ষে ভোট দেয় এবং কোনো দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়নি; তিনটি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।
এরপর ২০০৫ সালের বিশ্ব সম্মেলনের ফলাফল নথিতেও একই বিষয় পুনরায় উঠে আসে। সাধারণ পরিষদের ৬০/১ নম্বর প্রস্তাবের ১৭৭ অনুচ্ছেদে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা জাতিসংঘ সনদের ৫৩, ৭৭ ও ১০৭ অনুচ্ছেদ থেকে ‘শত্রু রাষ্ট্র’–সংক্রান্ত উল্লেখ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। তবে জাতিসংঘের পরবর্তী নথি বলছে, ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রক্রিয়া পরবর্তী সময়ে এগোয়নি।
এই জায়গাতেই বর্তমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। জাপান মনে করছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘শত্রু রাষ্ট্র’–সংক্রান্ত ধারাগুলো মুছে ফেলা উচিত। তিনি ২০০৫ সালের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন। জাপানের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতিসংঘে গত সাত দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির অবদান বিবেচনায় নিয়েও সনদের এই পুরোনো উল্লেখগুলো বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
চীনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেইজিংয়ের যুক্তি হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়; যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে উঠেছে, সেটি বোঝার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগেও ‘শত্রু রাষ্ট্র’–সংক্রান্ত ধারাগুলোকে জাতিসংঘ সনদের গুরুত্বপূর্ণ বিধান হিসেবে উল্লেখ করেছে। আগস্টে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বক্তব্যে বলা হয়েছিল, টোকিও ট্রায়ালের ৮০তম বার্ষিকীর প্রেক্ষাপটে এসব ধারার গুরুত্ব পুনরায় তুলে ধরা প্রয়োজন বলে বেইজিং মনে করে।
চীনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে জাপানের সামরিক নীতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সুন লেইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপান সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে, অস্ত্র রপ্তানির বিধিনিষেধে পরিবর্তন এনেছে এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। চীনের দৃষ্টিতে এসব পদক্ষেপ জাপানের সামরিক ভূমিকা পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। বেইজিং মনে করে, এ ধরনের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তবে জাপানের বক্তব্যের কেন্দ্র অন্য জায়গায়। দেশটি বলছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হলো শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে একতরফাভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন। সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে জাপান জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে একটি অবাধ ও উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে থাকার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে।
ফলে ‘শত্রু রাষ্ট্র ধারা’ নিয়ে চীন ও জাপানের মতপার্থক্যকে শুধু একটি আইনি প্রশ্ন হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি, জাপানের প্রতিরক্ষা নীতি এবং জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ কাঠামো—সবকিছুই যুক্ত। পুরোনো সনদের ভাষা বদলানোর প্রশ্নটি তাই বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘ সনদের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সনদের অংশ। জাতিসংঘের নিজস্ব নথিতে ৫৩ ও ১০৭ অনুচ্ছেদের ওই ভাষা এখনও দেখা যায়। একই সঙ্গে জাতিসংঘের নথিই দেখায় যে ১৯৯০-এর দশক থেকে এগুলো বাদ দেওয়ার বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে এবং ২০০৫ সালে আবারও তা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সনদ সংশোধনের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় ধারাগুলো রয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা চীন ও জাপানের বর্তমান অবস্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। জাপান পুরোনো যুদ্ধকালীন ভাষা সরিয়ে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জাতিসংঘ সনদ চায়। চীন অন্যদিকে মনে করে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল এবং সামরিকতাবাদ থেকে দূরে থাকার প্রশ্নকে দুর্বল করে এমন কোনো পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়।
চীনের পক্ষ থেকে জাপানের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। সুন লেইয়ের বক্তব্যে জাপানের নেতৃত্বকে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো, অতীতের বিষয়ে আত্মসমালোচনা করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আস্থা তৈরির পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। চীন বলেছে, জাপানের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন শান্তিপূর্ণ পথে হওয়া উচিত এবং সামরিকতাবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সমাজের ভূমিকা থাকা দরকার।
অন্যদিকে জাপান তার বর্তমান নিরাপত্তা নীতিকে আত্মরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় অবদানের কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করছে। ফলে দুই দেশের বক্তব্যে একই ঐতিহাসিক অধ্যায় থাকলেও তার ব্যাখ্যা ও বর্তমান প্রয়োগের জায়গায় বড় পার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্যই জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে বিষয়টিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
এ বছরের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিষয়টি ওঠার আরেকটি তাৎপর্য হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ৮০ বছর পরও সেই সময়ের কিছু আইনি ভাষা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। জাতিসংঘ সনদ পরিবর্তনের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মতি ও নির্ধারিত সংশোধনী প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে কোনো একটি দেশের অবস্থান বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে এসব ধারা সরাসরি পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ নেই।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, জাতিসংঘ সনদের ঐতিহাসিক ভাষা কি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সংশোধন করা হবে, নাকি ইতিহাস ও যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার প্রতীকী গুরুত্ব বিবেচনায় সেগুলো বহাল থাকবে। জাপান দ্রুত পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান জানালেও চীন তার বিরোধিতা করছে। ফলে বিষয়টি সামনে এগোলে শুধু চীন ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, জাতিসংঘ সনদ সংস্কার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যাখ্যা নিয়েও বৃহত্তর আলোচনা তৈরি হতে পারে।
বর্তমান বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘শত্রু রাষ্ট্র’–সংক্রান্ত বিধানগুলো সনদে এখনও লেখা থাকলেও এগুলো বাস্তবে কীভাবে বিবেচিত হয়, তা আলাদা একটি প্রশ্ন। জাতিসংঘের ইতিহাসে এসব ধারা বাদ দেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে একাধিক সিদ্ধান্ত ও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সংশোধন সম্পন্ন না হওয়ায় ভাষাগুলো এখনো সনদে রয়ে গেছে।
চীন সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার গুরুত্ব তুলে ধরছে। জাপান তুলে ধরছে বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতা। দুই অবস্থানের এই পার্থক্যই জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পুরোনো একটি বিধানকে আবারও আন্তর্জাতিক কূটনীতির আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ওয়েব যাচাইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও নিশ্চিত হয়েছে: ২০০৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৫৩, ৭৭ ও ১০৭ অনুচ্ছেদ থেকে ‘শত্রু রাষ্ট্র’–সংক্রান্ত উল্লেখ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলেছিল, কিন্তু পরবর্তী জাতিসংঘ নথি অনুযায়ী তা বাস্তবায়িত হয়নি।

