ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ থেকে আপাতত সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন না রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বার্তা ও রুশ সরকারের অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, মস্কো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিই আরও জোরদার করছে।
রাশিয়ার পার্লামেন্টে বুধবার দেওয়া ভাষণের সময় পুতিন এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে তার দল ইউনাইটেড রাশিয়া আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর রুশ পার্লামেন্টে ক্রেমলিনপন্থী প্রতিনিধিদের সংখ্যা বেড়েছে।
রুশ সরকার এই ফলাফলকে জনগণের বড় ধরনের সমর্থন হিসেবে তুলে ধরছে। তবে এর পর বড় প্রশ্ন হলো, এই রাজনৈতিক শক্তি পুতিন কীভাবে ব্যবহার করবেন এবং এর প্রভাব ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যতে কী হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে যুদ্ধ বন্ধের চেয়ে সামরিক লক্ষ্য অর্জনের ওপর জোর বেশি দেখা যাচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন বক্তব্য থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তিনি এখনো মনে করছেন সামরিক পথেই রাশিয়া নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে।
রাশিয়ার গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং শীতকালে সম্ভাব্য রুশ হামলার চাপ মস্কোকে উৎসাহিত করছে। কিয়েভও জানিয়েছে, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও নতুন ধরনের ড্রোন মোকাবিলা করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে ইউরোপের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশলও চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। মস্কোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক ও আর্থিক সহায়তাই ইউক্রেন যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া সাইবার হামলা, নাশকতা এবং বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ইউরোপের দেশগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তবে রাশিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়ার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোই সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বিবিসিকে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধকে মস্কো রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপের সংঘাত হিসেবে দেখছে। তার দাবি, পশ্চিমা অস্ত্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলো এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের মতে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করেছিল রাশিয়াই।
ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে পারমাণবিক হুমকির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাশিয়ার কিছু প্রভাবশালী বিশ্লেষক ইউরোপের সহায়তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া সরাসরি ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে—এমন সম্ভাবনা কম। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চললেও রাশিয়া এখনো ইউক্রেনের পুরো ডনবাস অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি।
তাদের মতে, ইউরোপের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন কমানো রাশিয়ার কৌশলের একটি অংশ হতে পারে।
রাশিয়ার কর্মকর্তারা বারবার বলছেন, তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। অন্যদিকে ইউক্রেন ও তার মিত্ররা এটিকে আগ্রাসন হিসেবে দেখছে।
আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান অব্যাহত থাকলেও রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়ে গেছে। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।
আগামী দিনে পুতিনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, রাশিয়ার সামরিক কৌশল এবং ইউরোপের প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে এই সংঘাত কোন দিকে এগোবে।

