ইসরায়েলগামী একটি উড়োজাহাজে ছুরিকাঘাতে আহত হওয়ার পরও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় আলোচনায় উঠে এসেছেন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার।
ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে সহকারী পাইলটের হামলার শিকার হন ক্যাপ্টেন মাচ্ছার। পরে পরিস্থিতির কারণে উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছে রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে ‘সত্যিকারের নায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, মাচ্ছার ১৭৪ জনের জীবন রক্ষা করেছেন এবং আকাশে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে ভূমিকা রেখেছেন।
ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার ভারতের মুম্বাইয়ে বেড়ে উঠেছেন। তার বাবা-মা এখনো সেখানেই বসবাস করেন। ২০১১ সালে তিনি ভারতীয় বিমান সংস্থা স্পাইসজেটে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে দুবাইয়ে চলে যান এবং ২০২২ সালে অভিজ্ঞ পাইলট হিসেবে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন।
তার পেশাগত তথ্য অনুযায়ী, মাচ্ছারের মোট উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ৯ হাজার ৭৫০ ঘণ্টার বেশি। এর মধ্যে ৬ হাজার ৪০০ ঘণ্টার বেশি সময় তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত পাইলট হিসেবে উড়োজাহাজ পরিচালনা করেছেন।
তার সাবেক প্রতিষ্ঠান স্পাইসজেট এক বিবৃতিতে তাকে ‘নায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, তিনি বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন।
পাইলট হওয়ার পথটিও ছিল কিছুটা আকস্মিক। গত বছর একটি পডকাস্টে মাচ্ছার জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই তার পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল না। প্রায় ১৯ বছর বয়সে তিনি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন এবং পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
পরে একটি বিমান চলাচলবিষয়ক সেমিনারে অংশ নেওয়ার পর তার আগ্রহ তৈরি হয়। এরপরই তিনি বিমান চালনাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
মাচ্ছার জানিয়েছিলেন, পাইলটের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কাজের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দিতেন না। নিরাপত্তাকে সব সময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তরুণ পাইলটদের ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তার কর্মজীবনে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। একবার একটি ফ্লাইটে একজন যাত্রী হঠাৎ প্রসববেদনায় আক্রান্ত হলে ক্রুদের সঙ্গে সমন্বয় করে শিশুর নিরাপদ জন্ম নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন।
মাচ্ছার বলেছিলেন, সংকটময় পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ পাইলটদের কাছ থেকে শেখা বিষয়গুলো তাকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।
ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল।
ফ্লাইটে অন্তত ১৫০ জন যাত্রী ছিলেন। উড়োজাহাজটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের আকাশসীমায় থাকা অবস্থায় এটি হঠাৎ দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে।
কিছু সময় পর উড়োজাহাজটি জরুরি সংকেত পাঠায়। পরে ছিনতাইয়ের সংকেত হিসেবেও ব্যবহৃত একটি সংকেত পাঠানো হয়।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষের কথা বলা হয়। পরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী জানান, একজন পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, একজন যাত্রী ও এক ক্রু সদস্য ককপিটে প্রবেশ করে হামলাকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করেন।
এরপর উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।
ঘটনার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের সাহসের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, গুরুতর আহত হওয়ার পরও অন্যদের জীবন রক্ষায় মাচ্ছার অসাধারণ সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও বিপদের মুহূর্তে তার উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসের প্রশংসা করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘটনাটি নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, পাইলট কঠিন পরিস্থিতিতেও সাহস দেখিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বর্তমানে ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার শুধু একজন আহত পাইলট নন, বরং সংকটময় মুহূর্তে দায়িত্ব ও পেশাদারিত্বের উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।

