যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে করা বৃহৎ কৌশলগত বিনিয়োগ প্যাকেজের অংশ হিসেবে এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে বুধবার ট্রাম্প জানান, দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে ২০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করবে। এই বিনিয়োগের মধ্যে আটটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন এবং টেক্সাসে ৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প রয়েছে।
এই ঘোষণা গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এসেছে। ওই চুক্তির আওতায় মোট ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজের কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫০ বিলিয়ন ডলার জাহাজ নির্মাণ খাতে এবং ২০০ বিলিয়ন ডলার কৌশলগত বিনিয়োগের জন্য নির্ধারিত ছিল।
ট্রাম্প বলেন, এই বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প, জ্বালানি উৎপাদন এবং প্রযুক্তি খাতকে শক্তিশালী করবে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার জানিয়েছে, সব প্রকল্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে আলাস্কা এলএনজি প্রকল্পে বিনিয়োগের বিষয়টি এখনো বাণিজ্যিক ও আইনি যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করছে।
সিউলের শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলাস্কা এলএনজি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা এবং প্রয়োজনীয় আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে। বিনিয়োগের পরিমাণ বা প্রকল্পে অংশগ্রহণের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংও জানিয়েছেন, এলএনজি প্রকল্প ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আলাস্কা এলএনজি প্রকল্পটি বহু বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আলাস্কার উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণ উপকূল পর্যন্ত প্রায় ৮০৭ মাইল দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হবে। পরে তা তরলীকৃত করে এশিয়ার বাজারে রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহন এবং বছরে প্রায় ২ কোটি মেট্রিক টন এলএনজি উৎপাদনের সক্ষমতা রাখবে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রপ্তানি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে প্রকল্পটির ব্যয়, অর্থায়ন এবং বাণিজ্যিক লাভজনকতা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ এই প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য অর্থায়নের উৎস হতে পারে। তবে সিউলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্যাকেজের সব প্রকল্পকেই অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হতে হবে।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া নিশ্চিত করেছে যে টেক্সাসের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং আটটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে ১২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
টেক্সাসের বিদ্যুৎ প্রকল্পটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টার এবং বিদ্যুৎনির্ভর শিল্প স্থাপনায় সরবরাহের জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বর্তমানে এআই প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার একটি বড় অংশ সেই নতুন চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই করা হচ্ছে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধী রাজনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের আর্থিক ঝুঁকি ও লাভজনকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে। তবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, দীর্ঘমেয়াদি লাভ এবং আইনি অনুমোদনই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

