যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে আরও জোরালো পাল্টা আঘাতের পরিকল্পনা; মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও লক্ষ্যবস্তু বিবেচনায়
একদিকে আলোচনার দরজা খোলা রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার জবাব দিতে সামরিক প্রস্তুতি—ইরান এখন যেন একই সঙ্গে দুই পথে এগোচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করলে এবার আগের চেয়ে আরও ব্যাপক ও কঠোর পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান। ইরানের সামরিক কমান্ডার ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য হামলার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা করছেন।
তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইরানের তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং আলোচনার বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তির বরাতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলার জবাব দিতে ইরান লক্ষ্যবস্তুর পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্থাপনা নয়, মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থনকারী দেশগুলোর কিছু স্থাপনাও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে।
এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থান নিয়েও ভাবা হচ্ছে বলে ওই সূত্রগুলো জানিয়েছে।
যুদ্ধের প্রস্তুতি, তবু আলোচনার পথ খোলা
পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইরান এখনো কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
তেহরান একদিকে সম্ভাব্য হামলার জবাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলোচনায় মনে করছেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক সফর শেষে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশে ফেরার পর সামরিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার জবাব নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
প্রশ্নটা শুধু ‘হামলা হলে কী হবে’—এখন আলোচনার বড় অংশজুড়ে আছে কতটা জবাব দেওয়া হবে এবং কোথায় দেওয়া হবে।
তেহরানের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা
ইরানের সামনে এখনো একটি বড় প্রশ্নের উত্তর নেই—যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেবে?
বড় আকারের সামরিক অভিযান, নাকি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো সীমিত কোনো আক্রমণ—ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা নিয়ে তেহরান এখনো নিশ্চিত নয়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, এই অনিশ্চয়তাই ইরানের হিসাবকে জটিল করে তুলেছে।
তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান যদি মনে করে প্রতিপক্ষের পদক্ষেপকে সীমিত পাল্টা পদক্ষেপে ঠেকানো যাবে না, তাহলে তারা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আবার দেখানোর জন্য সংঘাত আরও বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারে।
শুধু ইরান নয়, প্রস্তুত হচ্ছে মিত্ররাও
ইরানের পাল্টা জবাবের পরিকল্পনা শুধু দেশটির নিজস্ব সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ইরানের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় আকারের হামলা চালালে লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা ইরান-সমর্থিত মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সম্ভাব্য জবাবের পরিধি হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল এবং এর বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সাত মাসের সংঘাতের পর আবারও অনিশ্চয়তা
বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে গত কয়েক মাসের দীর্ঘ সংঘাত।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে ইরানকে ঘিরে নতুন সংঘাত শুরু হয়। পরে ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিতে ৪০ দিনের যুদ্ধের অবসান ঘটে। তবে যুদ্ধবিরতির পরও বিভিন্ন সময় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল।
এখন নতুন করে বড় হামলার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় সেই অস্থিরতা আবারও সামনে এসেছে।
সংঘাত বাড়লে চাপ পড়বে দুই দেশেই
ইরান শুধু সামরিক হিসাবেই বিষয়টি দেখছে না। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও কী ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে, সেটিও তেহরানের বিবেচনায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন জনমত জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে সমর্থনের ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দেশটিতে জ্বালানির উচ্চমূল্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে এসব বিষয় ভবিষ্যৎ মার্কিন সিদ্ধান্তকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সামনে কী?
এ মুহূর্তে তেহরানের অবস্থান অনেকটা দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
একদিকে তারা আলোচনা চালিয়ে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার জন্য এমন একটি পাল্টা জবাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার পরিধি আগের চেয়ে বড় হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তাৎক্ষণিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে আলোচনায় থাকা সামরিক পরিকল্পনাগুলোর কতটা বাস্তবে কার্যকর হবে, সেটিও এখনো অনিশ্চিত।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান শুরু হলে তার প্রতিক্রিয়া শুধু একটি দেশের সীমান্তে আটকে থাকার সম্ভাবনা কম।
আর সেই কারণেই এখন তেহরানের প্রতিটি সামরিক প্রস্তুতি এবং প্রতিটি কূটনৈতিক বার্তা—দুটিই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পুরো অঞ্চল।

