ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সর্বোচ্চ আদালত আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে আরব দলগুলোর অংশগ্রহণে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছে। আদালত জানিয়েছে, দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি শর্ত পূরণ হয়নি। সূত্র: আল জাজিরা
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা সর্বসম্মতভাবে দেশটির দুটি প্রধান আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক তালিকা—রা’আম (সংযুক্ত আরব তালিকা নামেও পরিচিত) এবং হাদাশ, তা’আল ও বালাদের জোট জয়েন্ট লিস্টকে—কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির অযোগ্য ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন।
২৭ অক্টোবরের নেসেট নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। সমালোচকেরা কমিশনের বিরুদ্ধে দ্বৈত নীতি অনুসরণের অভিযোগ তুলেছিলেন। আদালতের সিদ্ধান্তের ফলে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা, যারা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ, নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় থাকার সুযোগ পেলেন।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালত ৭-২ ভোটে আরব-ইহুদি হাদাশ পার্টির বর্তমান নেসেট সদস্য ওফার কাসিফকে পুনর্বহাল করেছে। কাসিফ ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণের একজন স্পষ্টভাষী সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
তবে ভিন্নমত দেওয়া দুই বিচারপতি বলেছেন, কাসিফ “ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে” সমর্থন করেন, যা তাকে অযোগ্য ঘোষণার একটি কারণ হতে পারে।
এর আগে সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমকে দল হিসেবে এবং কাসিফ ও বালাদ পার্টির প্রধান সামি আবু শেহাদেহকে ব্যক্তি হিসেবে অযোগ্য ঘোষণার পক্ষে ভোট দেয়।
বালাদ নেতা সরে দাঁড়ালেন
ইসরায়েলে কোনো প্রার্থী বা দলকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য নির্বাচন কমিটি সিদ্ধান্ত নিলে সুপ্রিম কোর্ট প্রায় সব সময়ই সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছে।
তবে বৃহস্পতিবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট ইৎজাক অমিত সামি আবু শেহাদেহকে জানান, নয়জন বিচারপতির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ইসরায়েলি পাবলিক ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, তাকে শুক্রবার পর্যন্ত নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তিনি তা না করলে আদালত তাকে অযোগ্য ঘোষণা করবে।
এরপর আবু শেহাদেহ নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান।
প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী মিত্র ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর লেখা একটি নিবন্ধের কারণে আবু শেহাদেহকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন।
ওই লেখায় আবু শেহাদেহ হামলাটিকে “একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে তিনি হামলাকে সমর্থন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বালাদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্বেচ্ছায় প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরিবর্তে আদালতের নির্দেশে আবু শেহাদেহকে সরিয়ে দেওয়া হলে তা “দেশের রাজনৈতিক ও সংসদীয় জীবনের জন্য গুরুতর পরিণতি” তৈরি করত। কারণ এতে আরব প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি নতুন নজির তৈরি হতো।
দ্বৈত নীতির অভিযোগ
২০২১ সালের নির্বাচনের পর রা’আম পার্টি ইসরায়েলের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তৈরি করে। দলটি প্রথম আরব দল হিসেবে ইসরায়েলি সরকারে যোগ দেয় এবং এমন একটি জোটের অংশ হয়, যা কিছু সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়।
এর আগে ইসরায়েলের অধিকাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক জোট সরকারে অংশ নেওয়ার রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন।
আসন্ন নির্বাচনে রা’আম প্রথমবারের মতো একজন ইহুদি জায়নবাদী প্রার্থী ইয়োভ সেগালোভিটজকেও প্রার্থী করেছে। তিনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উপমন্ত্রী হিসেবে অপরাধ দমনে কাজের কারণে আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিচিতি পেয়েছেন।
সেপ্টেম্বরে নির্বাচন কমিটির ভোটে দ্বৈত নীতির অভিযোগ ওঠে। কারণ ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীদের নেতৃত্বাধীন দলগুলো নির্বাচনী ব্যালটে থাকার সুযোগ পায়। এসব দলের কয়েকজন নেতার ওপর আন্তর্জাতিকভাবে নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
শুক্রবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সামি আবু শেহাদেহ বলেন, তিনি “অন্য কোনো উপায় না থাকায়” নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
যদিও সুপ্রিম কোর্ট আরব দলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ ফিরিয়ে দিয়েছে, আবু শেহাদেহ বলেন, এই সিদ্ধান্ত মূল অযোগ্য ঘোষণার ঘটনাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে না।
তিনি বলেন, “শেষ পর্যন্ত, গতকাল যা ঘটেছে তা ইসরায়েল রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের জন্য, বা বলা যায় গণতন্ত্রের অতি সংকীর্ণ পরিসরের জন্য একটি ঐতিহাসিক বিপর্যয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে কারণ আমি ভিন্নভাবে চিন্তা করি, কারণ আমরা আজ যেখানে বাস করছি, সেখানকার ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কীভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত, সে বিষয়ে আমার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।”

