ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতিতে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী এবং প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টের নেতৃত্বাধীন নৌবহর এবং সংশ্লিষ্ট সেনাসদস্যদের মোতায়েনের ফলে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও বড় হবে।
চলতি বছরের নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট ও এর সঙ্গে থাকা নৌবহর মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরী রয়েছে। এগুলো হলো ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। নতুন রণতরী পৌঁছালে মধ্যপ্রাচ্যের আশপাশে একসঙ্গে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অবস্থান করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
নতুন এই সামরিক মোতায়েন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা বাড়ছে।
নতুন নৌবহরের সঙ্গে থাকা জাহাজগুলো শুধু বিমানবাহী রণতরীকেন্দ্রিক নয়। এর সঙ্গে উভচর হামলায় সক্ষম নৌবহরও রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টের নেতৃত্বাধীন রণতরী বহর এবং ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ডের নেতৃত্বাধীন উভচর প্রস্তুতি নৌবহর মিলিয়ে ৭ হাজারের বেশি নাবিক এবং প্রায় ২ হাজার মেরিন সেনা এ মোতায়েনের অংশ হতে পারেন।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় সমাবেশ তৈরি হতে পারে। তিনটি বিমানবাহী রণতরী, সংশ্লিষ্ট যুদ্ধজাহাজ, শত শত যুদ্ধবিমান এবং ২০ হাজারের বেশি মার্কিন নৌসেনা ও নাবিক—সব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে ওয়াশিংটনের সামরিক উপস্থিতি আগের তুলনায় আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিমানবাহী রণতরী শুধু একটি যুদ্ধজাহাজ নয়। এর সঙ্গে থাকে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান, সহায়ক জাহাজ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ফলে একটি রণতরী বহর কোনো অঞ্চলে পৌঁছানো মানে সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান পরিচালনা, প্রতিরক্ষা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা তৈরি করা। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে তাই শুধু সেনা সংখ্যা বাড়ানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা কঠিন।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার পটভূমিতে কূটনৈতিক উদ্যোগও চলেছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সময় কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান থেকে একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে সামরিক ও কৌশলগতভাবে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। তিনি এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং অন্যান্য বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আগ্রহ ইরানের রয়েছে বলে দাবি করেছেন। তবে ইরানের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি—দুটি বিষয় একই সময়ে চলতে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালী এই সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ওই এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনার সঙ্গে তেলের বাজারে অস্থিরতাও দেখা গেছে।
এদিকে একটি ফ্লাইদুবাই যাত্রীবাহী বিমানে কো-পাইলটের হাতে ক্যাপ্টেন ছুরিকাহত হওয়া এবং বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টার ঘটনায় ইরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটিতে ইরানের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে এখন পর্যন্ত ওই ঘটনার সঙ্গে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা রয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হতে পারে। একই সঙ্গে হামলাকারী ব্যক্তি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, কিংবা অন্য কোনোভাবে উগ্রপন্থী প্রভাবের মধ্যে ছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে নতুন মার্কিন সেনা ও রণতরী মোতায়েনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ সামরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ওয়াশিংটন একই সময়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপও অব্যাহত রেখেছে। অর্থাৎ ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থানে সামরিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক চাপ—দুই দিকই পাশাপাশি কাজ করছে।
সাম্প্রতিক মোতায়েনের আরেকটি তাৎপর্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক বিকল্পের পরিধি বাড়বে। একাধিক বিমানবাহী রণতরী ও উভচর নৌবহর একই অঞ্চলে থাকলে দ্রুত বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হয়। তবে এই সামরিক উপস্থিতি ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নির্ভর করবে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ইরানের সঙ্গে পরিস্থিতির ওপর।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই সামরিক সমাবেশ কেবল প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি হিসেবে থাকবে, নাকি এর পরিধি আরও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালাবে কি না, কিংবা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে কি না—তা এখনো নিশ্চিত নয়। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, দুই পথই একই সময়ে আলোচনায় রয়েছে।
তবে সামরিক উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুল হিসাব বা আকস্মিক সংঘর্ষের ঝুঁকিও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে একটি ছোট ঘটনা দ্রুত বড় সামরিক সংকটে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যেও পৌঁছাতে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট পাঠানোর সিদ্ধান্ত এবং প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়। নভেম্বরের শেষ নাগাদ নতুন নৌবহর অঞ্চলটিতে পৌঁছানোর কথা থাকায় আগামী কয়েক সপ্তাহে কূটনৈতিক আলোচনা, সামরিক তৎপরতা এবং হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে থাকবে।
এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতি কমাচ্ছে না; বরং নতুন রণতরী ও হাজারো সেনা পাঠানোর মাধ্যমে সেখানে নিজের প্রস্তুতি আরও জোরদার করছে। এর পরবর্তী ফলাফল নির্ভর করবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।

