জাপানের রাজধানী টোকিওতে অভিনব এক ঘুমের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। সেরা ঘুমের জন্য বিজয়ী পাবেন ২২ লাখ ২০ হাজার ইয়েন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। তবে এই পুরস্কার জেতা মোটেও সহজ নয়। প্রতিযোগীদের ৯০ মিনিটের একটি সেশনে গভীর, স্থিতিশীল ও মানসম্মত ঘুমের প্রমাণ দিতে হবে। আয়োজকদের মতে, ঘুমের অভাব নিয়ে মানুষকে সচেতন করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
প্রতিযোগিতাটির আয়োজক জাপানের একটি ম্যাট্রেস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। আগামী ৫ অক্টোবর টোকিওর শেয়ার গ্রিন মিনামি আওয়ামায় এটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মোট তিনটি সেশন হবে। প্রতিটি সেশনের জন্য লটারির মাধ্যমে প্রায় ২০ জন প্রতিযোগী বাছাই করা হবে। অংশ নিতে কোনো ফি লাগবে না। আবেদনের শেষ সময় ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর।
প্রতিযোগিতার নিয়ম বেশ কড়া। প্রত্যেক প্রতিযোগীকে ঘুম পর্যবেক্ষণের একটি ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে। ৯০ মিনিটের এই স্বল্প সময়ের ঘুমের সেশনে আয়োজকেরা চারটি বিষয় খতিয়ে দেখবেন। এগুলো হলো ঘুমের গভীরতা, সামগ্রিক মান, স্থিতিশীলতা এবং ঘুমাতে যেতে কত সময় লাগছে।
শুধু এসে শুয়ে পড়লেই চলবে না। প্রতিটি সেশনের আগে প্রতিযোগীদের একাধিক ঘুম-পূর্ব ব্যায়াম সম্পন্ন করতে হবে। বিষয়টিকে আরও অনিশ্চিত করতে প্রত্যেককে এলোমেলোভাবে একটি ‘স্লিপ আইটেম’ দেওয়া হবে। সেটি ঘুমের মানে ভালো বা খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।
কৌশল করে সুবিধা নেওয়ার পথও বন্ধ। ইচ্ছাকৃতভাবে সারা রাত জেগে থেকে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করা যাবে না। আগের রাতে না ঘুমানো, ঘুমের ওষুধ খাওয়া কিংবা ঘুম আনার জন্য অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহারও নিষিদ্ধ।
আয়োজকেরা আরও জানিয়েছেন, সেশনের মধ্যে হঠাৎ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানো হতে পারে। অপ্রত্যাশিত বিরক্তির মধ্যেও কে ঘুম ধরে রাখতে পারেন, সেটিও যাচাই করা হবে।
সেশনে সংগৃহীত তথ্য মূল্যায়ন করবেন চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীরা। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সেরা প্রতিযোগী নির্ধারিত হবে। মূল পুরস্কারের পাশাপাশি থাকছে কয়েকটি বিশেষ পুরস্কার। ঘুমের গভীরতার জন্য রয়েছে ‘ডিপ স্লিপ ডাইভ অ্যাওয়ার্ড’। অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘুমাতে পারা প্রতিযোগীদের জন্য আছে ‘স্লিপ-টার্নিং অ্যাক্রোব্যাট অ্যাওয়ার্ড’।
এ ধরনের আয়োজন এবারই প্রথম নয়। পর্যাপ্ত বিশ্রামের গুরুত্ব তুলে ধরতে গত মার্চে চীনেও নগদ পুরস্কারসহ খোলা জায়গায় একটি ঘুমের প্রতিযোগিতা হয়েছিল।
প্রতিযোগিতাটি প্রথম দেখায় মজার মনে হলেও এর পেছনের বার্তা গুরুতর। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘুমের সময়ের দিক থেকে জাপানের মানুষ বিশ্বের সবচেয়ে কম ঘুমানো জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সংস্কৃতিতে ঘুমকে অনেক সময় সময়ের অপচয় ভাবা হয়। এমন বাস্তবতায় বড় অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা মানুষের নজর কাড়ার একটি কার্যকর কৌশল।
এখানে বাণিজ্যিক দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। আয়োজক একটি ম্যাট্রেস কোম্পানি। ফলে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের ব্র্যান্ডকে আলোচনায় আনাও এর অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশ্বজুড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান সামাজিক বিষয়কে সামনে রেখে এমন প্রচারণা চালায়। তবে এতে বিষয়টির গুরুত্ব কমে না।
প্রতিযোগিতার নিয়মেও একটি বার্তা আছে। না ঘুমিয়ে এসে বা ওষুধ খেয়ে জেতার চেষ্টা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ ভালো ঘুম কেবল ক্লান্তির ফল নয়, এর জন্য নিয়মিত অভ্যাস ও সুস্থ জীবনযাপন দরকার। ঘুমের আগে ব্যায়ামের শর্তও ইঙ্গিত দেয়, ঘুমের প্রস্তুতি ঘুমের মানকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের পাঠকের জন্যও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। শহুরে জীবনে দেরি করে ঘুমানো, মোবাইল ফোনের ব্যবহার ও কাজের চাপে অনেকেরই পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। অপর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, কর্মক্ষমতা ও সামগ্রিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলে বলে চিকিৎসকেরা বলে থাকেন। কারও দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে টোকিওর এই প্রতিযোগিতা কৌতুক ও সচেতনতার এক অভিনব মিশেল। এর ফলাফল কী হয় এবং আয়োজকেরা কী তথ্য প্রকাশ করেন, তা জানতে আগ্রহ থাকবে। তবে প্রতিযোগিতা শেষে যদি মানুষ নিজের ঘুমের প্রতি একটু বেশি যত্নবান হয়, সেটিই হবে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য।

