ফ্লাই দুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত করার কথিত চেষ্টার মুখে পাইলট ও যাত্রীদের সম্মিলিত লড়াইয়ে বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে। গত বুধবার দুবাই থেকে তেল আবিবগামী এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে সহকারী পাইলট ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করলে উড়োজাহাজটি খাড়া নিচের দিকে নামতে শুরু করে। রক্তাক্ত অবস্থায়ও ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার ককপিটের দরজা খুলে দেন। এরপর যাত্রীরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করেন এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনেন। সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণে ১৭৪ আরোহী নিরাপদে নামেন।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৭টা ৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ০৩:০৫) উড়োজাহাজটি দুবাই থেকে রওনা দেয়। এটি ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় চলছিল। যাত্রার দুই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর হঠাৎ তীব্র গতিতে নিচে নামতে শুরু করে। একবার ওপরে উঠে আবার খাড়া নিচের দিকে পড়তে থাকে। মাত্র কয়েক মিনিটে উড়োজাহাজটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে আসে। খাড়া পতন শুরুর ১২ মিনিট পর, গ্রিনিচ মান সময় ০৫:৩৩ মিনিটে প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় এর গতি ও অবস্থান স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

কেবিনে তখন চরম আতঙ্ক। স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তানসহ ফ্লাইটে থাকা যাত্রী অ্যাডাম পোলো সিএনএনকে জানান, প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল এটি সাধারণ এয়ার পকেট। এক সেকেন্ড পরই বোঝা যায়, পতনটি স্বাভাবিক নয়। তাঁর বর্ণনায়, বিদ্যুৎ-সংযোগ, মাল্টিমিডিয়া ব্যবস্থা ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। করিডরে দাঁড়ানো কিংবা টয়লেটে যাওয়া যাত্রীরা ছিটকে পড়েন। আসনে বসা ছাড়া প্রায় সবাই নিচে পড়ে যান। তিনি পরিস্থিতিকে জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক রোলার কোস্টারের সঙ্গে তুলনা করেন, যার তীব্রতা ছিল হাজার গুণ বেশি। অন্য যাত্রীরাও জানান, কেবিনে মানুষ চিৎকার করছিলেন এবং একের পর এক তীব্র ঝাঁকুনি হচ্ছিল।
ককপিটের ভেতরে তখন চলছিল আলাদা লড়াই। শুক্রবার সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের শয্যা থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কলে ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার সেই মুহূর্তের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে পড়ে যাওয়ার সময় তিনি বুঝতে পারছিলেন উড়োজাহাজটি খাড়া নিচের দিকে আছড়ে পড়ছে। তাঁর ভাষ্য, কিছু করার সেটাই ছিল শেষ সুযোগ, আর দরজাটি ছিল ঠিক তাঁর পাশেই। আহত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থেকেও তিনি শেষ শক্তি সঞ্চয় করে ভেতর থেকে দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নেন।
উড্ডয়নের সময় ককপিটের দরজা সাধারণত তালাবদ্ধ থাকে এবং শুধু পাইলটরাই তা খুলতে পারেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান সংবাদমাধ্যমকে জানান, মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থেকেও মছার শেষ মুহূর্তের শক্তি দিয়ে লক খুলতে সক্ষম হন। মছার মোদিকে বলেন, দরজা খোলার পর অন্যরা ভেতরে আসেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তিনি নিজের জীবন বাঁচাতে লড়ছিলেন, তবে একই সঙ্গে মনে মনে প্রতিজ্ঞা ছিল, অন্যদের মরতে দেবেন না। তিনি আরও জানান, গত ১৭ বছর ধরে তিনি উড়োজাহাজ চালাচ্ছেন, তাই চোখ বন্ধ করেও বুঝতে পারেন ভেতরে কী ঘটছে।
যাত্রী জভিকা মানেস ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে জানান, তাঁর স্ত্রী ছোট মেয়েকে নিয়ে সামনের দিকের টয়লেটে যাচ্ছিলেন। তখনই ককপিটের ভেতর থেকে চিৎকার ও ধস্তাধস্তির শব্দ শোনা যায়। তিনি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টকে বিষয়টি জানানোর মুহূর্তেই সহকারী পাইলটের ছুরিকাঘাতের মুখে মূল পাইলট ককপিটের দরজা দিয়ে বাইরে ছিটকে পড়েন। জভিকা দ্রুত মেয়েকে টয়লেট থেকে বের করে এনে হামলাকারীকে ঠেকাতে সামনে ছুটে যান।
স্পিলম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তেজনা টের পেয়ে কয়েকজন যাত্রী একযোগে সামনে ছুটে গিয়ে ককপিটে ঢুকে পড়েন। তাঁরা দেখেন, আহত পাইলট মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন আর হামলাকারী সহকারী পাইলট কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর দাঁড়িয়ে সেটি ভাঙচুর করছেন। সহকারী পাইলটকে কাবু করতে ভূমিকা রাখা যাত্রী আসাফ রাজুয়ান চ্যানেল ১২-কে বলেন, পুরো ঘটনা ছিল সিনেমার মতো। বাস্তবে এমন কিছু ঘটতে পারে, তা তাঁর ভাবনার বাইরে ছিল।
ইসরায়েলি যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুন, যাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ইসরায়েলি প্লাম্বার’ বলে উল্লেখ করেছেন, পরে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানান। তিনি জভিকা মানেস ও আসাফ রাজুয়ানের সঙ্গে ককপিটে জোর করে ঢোকেন। দরজার কাছেই আহত ক্যাপ্টেনকে পড়ে থাকতে দেখেন। হায়ুনের ভাষ্য, ভেতরে ঢুকে তিনি দেখেন সহকারী পাইলট দুই আসনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্টিক ধরে টানাটানি করছেন। পাইলটের আসনে তখন কেউ ছিল না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীকে জাপটে ধরে ককপিটের বাইরে টেনে আনেন। তাঁর দাবি, সহকারী পাইলট ককপিটের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার চেষ্টা করছিলেন।
হামলাকারীকে কেবিনে আনার পর শুরু হয় আরেক ধস্তাধস্তি। ফ্লাইটে থাকা এক দন্তচিকিৎসক যখন আহত ক্যাপ্টেনের প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যস্ত, তখন যাত্রীরা কয়েক মিনিটের চেষ্টায় তারের হেডফোন দিয়ে হামলাকারীকে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন। উপস্থিত যাত্রীদের ভাষ্য, বাঁধন খোলার জন্য ছটফট করতে করতে সহকারী পাইলট চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমাকে মেরে ফেলো!’
এরপর হায়ুন আবার দ্রুত ককপিটে ঢুকে কন্ট্রোল স্টিক চেপে ধরেন এবং ওপরের দিকে টানতে শুরু করেন। তিনি জানান, উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা নিয়ে তৈরি টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘মে ডে’ দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এ প্রাথমিক ধারণা পেয়েছিলেন। উড়োজাহাজটি কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরতে থাকলে পেছনের আসনে থাকা আরেকজন পেশাদার পাইলট ককপিটে পৌঁছান এবং হায়ুনকে জানান, বাকিটা এখন থেকে তিনি সামলাবেন।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, উড়োজাহাজটি এত খাড়া কোণে নামছিল যে ঝাঁকুনিতে পেছনের দিক থেকে রাডার ছিঁড়ে যায়। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের বিমান এমন গতির জন্য তৈরি নয় এবং সেটি সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্পের বর্ণনায় আরও ছিল, তীব্র জি-ফোর্সের মধ্যেও ওই ব্যক্তি হামলাকারীকে আসন থেকে টেনে পেছনে ফেলে দেন এবং আগে কখনো উড়োজাহাজ না চালালেও স্টিক টেনে ধরে ক্র্যাশের ঠিক আগমুহূর্তে বিমানটিকে স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনেন।
ফ্লাইটে থাকা দন্তচিকিৎসক শোতা মুসায়েভ দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে জানান, চিৎকার শোনার ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি সামনে ছুটে যান। ককপিটে ঢুকে দেখেন, পাইলটের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক এবং মাথা থেকে প্রচণ্ড রক্ত ঝরছে। তাঁর ভাষ্য, পুরো ফ্লাইটে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন। বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় তিনি রক্তপাত বন্ধ করেন এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন। তাঁর বিশ্বাস, ৩৯ বছর বয়সী পাইলটের জীবন বাঁচাতে এই জরুরি চিকিৎসা বড় ভূমিকা রেখেছে। সহকারী পাইলট যেন নড়াচড়া করতে না পারেন, সে জন্য তাঁর হাত-পা কয়েকবার শক্ত করে বাঁধার কথাও তিনি চ্যানেল ১২-কে জানান।
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্যে ঘটনার সময়ক্রম এমন: গ্রিনিচ মান সময় ০৫:২১ মিনিটে উড়োজাহাজ খাড়া নিচের দিকে নামতে শুরু করে। ০৫:২৮ মিনিটে এটি আন্তর্জাতিক জরুরি সংকেত ‘৭৭০০’ পাঠানো শুরু করে। তবে নতুন পাইলট ককপিটে পৌঁছানোর আগে না পরে এ সংকেত পাঠানো হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। উড়োজাহাজটি তখন সৌদি আরব ও জর্ডানের সীমান্ত এলাকার আকাশসীমায় ছিল। ০৫:৩৩ মিনিটে ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় এসে এটি গতি ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণে আনে। দুই মিনিট পর, ০৫:৩৫ মিনিটে ট্র্যান্সপন্ডার কোড বদলে ‘৭৫০০’ করা হয়, যা বেআইনি অনুপ্রবেশ বা ছিনতাইয়ের চেষ্টার আন্তর্জাতিক সংকেত। এরপর উড়োজাহাজটি পশ্চিম দিকে মোড় নিয়ে কিছু সময়ের জন্য জর্ডানের আকাশসীমায় ঢোকে, পরে আবার সৌদি আরবের দিকে ফিরে আসে।
০৫:৪৪ মিনিটে সৌদি আরবের তাবুকের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণকক্ষ ফ্লাইটটি থেকে জরুরি বার্তা পায়। তাতে জরুরি অবতরণের অনুমতি চাওয়া হয়। তাবুক বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার সময় ট্র্যান্সপন্ডার কোড আবার বদলে ‘৭৭০০’ করা হয়। ০৬:৫৮ মিনিটে, উড্ডয়নের প্রায় চার ঘণ্টা পর, উড়োজাহাজটি তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করে। সেখানে জরুরি চিকিৎসা দল ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। ১৭৪ আরোহীর পাশাপাশি আহত হামলাকারী, রক্তাক্ত মূল পাইলট এবং সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হায়ুনকে নিরাপদে নামানো হয়।
ঘটনার পর নেতানিয়াহু স্মিথ মছারকে ‘প্রকৃত বীর’ আখ্যা দেন। নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে তিনি লেখেন, এই একটি কাজের মাধ্যমে পাইলট দারুণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন এবং ১৭৪ জনের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। গুরুতর আহত হয়েও তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং দরজা খুলে যাত্রী ও ক্রুদের হামলাকারীকে কাবু করার সুযোগ করে দেন। মোদি ক্যাপ্টেনের সাহসিকতা, ধৈর্য ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার প্রশংসা করে বলেন, এর ফলেই এত মানুষের প্রাণ বেঁচেছে এবং পুরো ভারত তাঁকে নিয়ে গর্বিত।
ক্যাপ্টেনের স্বাস্থ্য নিয়ে ভারতীয় দূতাবাসগুলো তথ্য দিয়েছে। রিয়াদে ভারতীয় দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, তাঁকে প্রথমে তাবুক শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, যেখানে উড়োজাহাজটি জরুরি অবতরণ করে। দূতাবাস তখন জানায়, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারতীয় দূতাবাস বৃহস্পতিবার জানায়, সৌদি আরবে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে আবুধাবিতে আনা হয়েছে এবং তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত ও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। ঘটনাটি এখনো কথিত চেষ্টা হিসেবেই বর্ণিত হচ্ছে। হামলার কারণ বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য নেই।

