ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে রাশিয়ার হামলা আরও তীব্র হয়েছে। শনিবার সকালে শহরের পিভনিচনি বা নর্দার্ন সেতুতে রুশ হামলায় দুজন আহত হয়েছেন। হামলায় সেতুর সড়কের অংশ এবং ট্রলিবাসের ওপর দিয়ে থাকা বিদ্যুৎ সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে সেতুটিতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক যানজট।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানিয়েছেন, হামলার পর জরুরি সেবাদানকারী দল ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করেছে। বাম তীর থেকে ডান তীরের দিকে সেতুটিতে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। রাজধানীর দুই গুরুত্বপূর্ণ সেতুর ওপর ধারাবাহিক হামলার কারণে শহরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যাতায়াত নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
নর্দার্ন সেতুতে হামলার ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন এর কয়েক ঘণ্টা আগেই কিয়েভের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সেতু পিভদেননি বা সাদার্ন সেতু রুশ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। চলতি সপ্তাহে ওই সেতুতে একাধিকবার রুশ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। শুক্রবারের হামলায় একটি রুশ ড্রোন সেতুটির তারে আঘাত করে। হামলার পর সেতু দিয়ে যান চলাচল এবং শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে।
কিয়েভের ডিনিপ্রো নদীর ওপর থাকা এই দুটি সেতু রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্ব অংশকে সংযুক্ত করে। বৃহস্পতিবারের আগে দীর্ঘদিন ধরে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো রুশ হামলার সরাসরি লক্ষ্য ছিল না। ফলে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলাকে কিয়েভের যোগাযোগব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর রুশ সামরিক তৎপরতার নতুন ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের ড্রোন দুটি সেতুতেই হামলা চালিয়েছে। মস্কোর দাবি, এসব সেতু ইউক্রেনীয় সেনা এবং সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের কাজে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে রাশিয়া আবারও বিদেশি নাগরিকদের, বিশেষ করে কূটনীতিকদের, কিয়েভ ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সেতুতে হামলার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে কিয়েভের সাধারণ মানুষের চলাচলে। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই শহরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এক তীর থেকে অন্য তীরে যাতায়াত করেন। সেতুগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। শুক্রবার পিভদেননি সেতুতে হামলার পরও রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহন আটকে থাকতে দেখা যায়।
পিভদেননি সেতুতে আগের হামলার পর পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে কিয়েভের প্রতিরক্ষা পরিষদ শুক্রবার জরুরি বৈঠক করে। এর পর মেয়র ক্লিৎসকো শহরের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাটকীয় বলে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার হামলার লক্ষ্য শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থাপনা নয়; গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থা, আবাসিক এলাকা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থাপনাও হামলার মধ্যে পড়ছে।
সাম্প্রতিক হামলার ধরন থেকে কিয়েভের যোগাযোগব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু ওই স্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শহরের এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের যোগাযোগ কমে গেলে বিকল্প সড়কে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে এবং জরুরি সেবার চলাচলও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কিয়েভের মতো বড় শহরে যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন সেতুগুলোর ওপর নির্ভর করেন, সেখানে এমন হামলার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক।
বিশেষ করে নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। পিভদেননি সেতুতে হামলার পর সেতুটি দিয়ে পাতাল রেল ও গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হন যাত্রীরা। শুক্রবারের হামলার পর যাত্রীদের কেউ কেউ জানান, বিস্ফোরণের অভিঘাতে সৃষ্ট ধুলা পাতাল রেলের কামরার বায়ু চলাচলের পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। এতে হামলার প্রভাব শুধু সড়ক যোগাযোগেই সীমাবদ্ধ ছিল না, গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাগুলোকে রাশিয়ার বৃহত্তর অবকাঠামোগত হামলার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়া সেতুর পাশাপাশি তথ্যকেন্দ্র, ইন্টারনেট, মুঠোফোন নেটওয়ার্ক, হাসপাতাল, শিশুশিক্ষাকেন্দ্র, বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করতে চাইছে। তাঁর দাবি, এর ফলে মানুষকে নিজেদের শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে রাশিয়ার বক্তব্য ভিন্ন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানোর পরই রাশিয়া ইউক্রেনের অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভালদাই বৈদেশিক নীতি সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে পুতিন দাবি করেন, ইউক্রেনের তেল শোধনাগার ও কৃষ্ণসাগরে থাকা জাহাজে হামলার জবাব হিসেবেই রাশিয়ার পাল্টা হামলা চলছে।
পুতিন আরও স্বীকার করেছেন যে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার কিছু প্রভাব পড়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব হামলার কারণে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় ১ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের বক্তব্য হলো, রাশিয়ার তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করার কারণ হচ্ছে এসব স্থাপনা থেকে পাওয়া অর্থ যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহার করা হয়।
দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই কিয়েভে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়ছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো রুশ হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে শীত মৌসুম ঘিরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর হামলার মাত্রা বিভিন্ন সময়ে বেড়েছে।
এবার সেতুগুলোতে ধারাবাহিক হামলা যুক্ত হওয়ায় রাজধানীর সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। সেতু শুধু সাধারণ যানবাহনের চলাচলের জন্য নয়, সামরিক সরঞ্জাম, জরুরি পণ্য এবং অন্যান্য সরবরাহ পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া যেহেতু দাবি করছে যে এসব সেতু ইউক্রেনীয় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হয়, তাই সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সেতুগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, এসব স্থাপনা ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে সামরিক যোগাযোগ ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে কোনো সেতুকে লক্ষ্য করা হলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে। যানজট, গণপরিবহন সংকট, বিকল্প পথে অতিরিক্ত চাপ এবং জরুরি সেবায় বিলম্ব—সব মিলিয়ে শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কিয়েভের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একদিকে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা, অন্যদিকে নতুন হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা করা। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সেতুগুলোতে মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু হামলা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে একটি স্থাপনা মেরামত করে স্বাভাবিক করার পর আবারও সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
কিয়েভে পরপর দুই গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে হামলার ঘটনা তাই শুধু সামরিক সংঘাতের আরেকটি পর্ব নয়; এটি রাজধানীর নাগরিক জীবন, পরিবহনব্যবস্থা এবং সরবরাহ কাঠামোর ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই নিজেদের হামলাকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে কিয়েভের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
সেতু দুটির ওপর হামলার পর এখন নজর থাকবে কিয়েভের যোগাযোগব্যবস্থা কত দ্রুত স্বাভাবিক করা যায় এবং রাশিয়ার হামলার এই ধারা সামনে আরও বিস্তৃত হয় কি না, তার ওপর। একই সঙ্গে ইউক্রেনের পাল্টা হামলা এবং রাশিয়ার জবাবি পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা যুদ্ধের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে কিয়েভের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি নগর অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের ওপর সংঘাতের ক্রমবর্ধমান প্রভাবও সামনে নিয়ে এসেছে।

