অক্টোবরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে নোবেল পুরস্কার আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। শান্তি ও সাহিত্য, এই দুই বিভাগ নিয়ে আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। কে পুরস্কার পেতে পারেন, তা নিয়ে বাজি ধরাও শুরু হয়ে যায়। এবার সাহিত্যের ঘোষণা আসবে ৮ অক্টোবর। তার আগে বিশ্লেষকদের আলোচনায় রয়েছেন লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও ইংরেজি ভাষার একাধিক লেখক।
প্রথমবার প্রদানের পর এক শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সাহিত্যের নোবেল অন্য সাহিত্য পুরস্কার থেকে আলাদা অবস্থান ধরে রেখেছে। এটি যেমন সম্মান ও অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ করে দেয়, তেমনি বিজয়ী বাছাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া ঘিরে গোপনীয়তাও বজায় রাখে। বুকারের দুটি সংস্করণ, প্রিঁ গঁকু ও ইন্টারন্যাশনাল ডাবলিন লিটারারি অ্যাওয়ার্ডের মতো প্রায় সব বড় সাহিত্য পুরস্কার প্রাথমিক ও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে। নোবেলের নির্বাচন প্রক্রিয়া সেসব থেকে ভিন্ন হলেও এর ঘিরে উত্তেজনার ঘাটতি নেই।
সুইডিশ একাডেমি অঞ্চল ও ভাষাকেও বিবেচনায় রাখে। অনেক বছর ধরে একাডেমি লাতিন আমেরিকার প্রতি তেমন মনোযোগ দেখায়নি। তাই এ বছর অঞ্চলটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমসাময়িক লাতিন আমেরিকান লেখকদের মধ্যে আর্জেন্টিনার সিজার আইরার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর বইয়ের কলেবর বড় নয়, তবে বুদ্ধিজীবী ও নিবেদিতপ্রাণ পাঠকদের মধ্যে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। হোর্হে লুইস বোর্হেস অনেক জল্পনা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত নোবেল পাননি, আইরা সেই দেশেরই লেখক।
আইরার পাশাপাশি আলোচনায় আছেন মেক্সিকান কবি ওমেরো আরিদজিস, লেখক হুয়ান ভিলোরো, ঔপন্যাসিক ক্রিস্তিনা রিভেরা গারজা, ব্রাজিলের মিল্টন হাতুম এবং চিলির কবি রাউল জুরিতা।
সমালোচকদের অনেকের মতে, সাহিত্য নোবেলে ইউরোপ সবসময়ই এগিয়ে থাকে এবং পুরস্কারটি এখনো ইউরোপ-কেন্দ্রিকতার গণ্ডি থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। এবার পুরস্কার ইউরোপে গেলে সম্ভাব্য তালিকার শীর্ষে থাকবেন ইতালীয় লেখক ক্লাউদিও মাগ্রিস ও রোমানিয়ান লেখক মির্চা কার্তারেস্কু। মাগ্রিস মূলত একটি উপন্যাস ‘দানিউব’-এর মাধ্যমেই বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন। তিনি পুরস্কার পেলে কেউ অবাক হবে না।
স্পেন ও জার্মানির নামও উঠে আসছে। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই দুই দেশের কোনো লেখক সাহিত্যে নোবেল পাননি। মারিও ভার্গাস ইয়োসাকে পেরুর লেখক ধরলে এই হিসাব মেলে। সেই বিবেচনায় স্পেনের এনরিকে ভিলা-মাতাস, আন্তোনিও মুনিওস মোলিনা, এদুয়ার্দো মেন্দোসা এবং জার্মানির বোটো স্ট্রাউসের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
এ ছাড়া দৌড়ে আছেন রাশিয়ার লুদমিলা উলিৎস্কায়া, মিখাইল শিশকিন ও ভ্লাদিমির সরোকিন, লেবানন-বংশোদ্ভূত ফরাসি লেখক আমিন মালুফ, ইউক্রেনের আন্দ্রেই কুরকভ এবং বুকার ইন্টারন্যাশনাল জয়ী ইসরায়েলি ঔপন্যাসিক ডেভিড গ্রসম্যান।
নোবেল কমিটি এখনো আমেরিকান উত্তর-আধুনিক সাহিত্যের কোনো লেখককে সম্মানিত করেনি। কার্ট ভনেগাট ও জন বার্থ দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পুরস্কার পাননি। তবে উইলিয়াম টি. ভোলম্যান, আশির বেশি বয়সী ডন ডেলিলো বা টমাস পিনচনের মতো লেখকদের পুরস্কৃত করার সুযোগ কমিটির সামনে এখনো আছে।
ইংরেজি ভাষার লেখকদের মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান লেখক রোহিনটন মিস্ত্রি, বুকারজয়ী কানাডিয়ান লেখক মাইকেল ওন্দাচ্চি, আইরিশ ঔপন্যাসিক জন ব্যানভিল, ব্রিটিশ লেখক ইয়ান ম্যাকইউয়ান ও জুলিয়ান বার্নস এবং অস্ট্রেলিয়ান লেখক রিচার্ড ফ্লানাগান। প্রতি পাঁচ-ছয় বছর অন্তর ইংরেজি ভাষার কোনো লেখকের পুরস্কার জেতা বিস্ময়কর নয়। কারণ, ইংরেজিতে লেখা অভিবাসী বা ডায়াসপোরা সাহিত্য বিশ্বজুড়ে পাঠক ও সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়ে।
অস্ট্রেলিয়ান ঔপন্যাসিক জেরাল্ড মারনেইনও আলোচনায় আছেন। তিনি পুরস্কার পেলে ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের পাঠকদের জন্য সেটি আনন্দের ঘটনা হবে। ১৯৭৩ সালে প্যাট্রিক হোয়াইট একমাত্র অস্ট্রেলীয় লেখক হিসেবে এই পুরস্কার জিতেছিলেন।
আফ্রিকা থেকে আলোচনায় আছেন মোজাম্বিকের ‘অ্যানিমিস্ট রিয়েলিস্ট’ লেখক মিয়া কুতো, দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর-আধুনিকতাবাদী লেখক ইভান ভ্লাদিস্লাভিচ, মরিশাসের আনন্দা দেবী এবং মরক্কোর তাহার বেন জেলুন ও আবদেললাতিফ লাবি। দুই বছর আগে হান কাং পুরস্কার জেতায় এ বছর এশিয়া থেকে কোনো লেখকের জেতার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে।
গত কয়েক বছরের বিজয়ীদের রচনার ধরন বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, নোবেল কমিটি পরীক্ষামূলক ও প্রথা-ভাঙা লেখার প্রতি বেশি আগ্রহী। এ বছরও সেই প্রবণতা বজায় থাকবে কি না, তা বলা কঠিন। উত্তর পেতে সাহিত্যপ্রেমীদের অপেক্ষা করতে হবে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত।

