ফ্রান্সের বিচারক থেকে আদালতের প্রধান পর্যন্ত, নিষেধাজ্ঞার তালিকা বাড়ছেই। আদালতের পাশে দাঁড়িয়েছে ইউরোপ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এখন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি চাপের মুখে। ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের বিচারক, কৌঁসুলি ও কর্মীদের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আদালতটিকে ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। আইনজ্ঞদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর অভূতপূর্ব আঘাত।
দৈনন্দিন জীবন থমকে গেছে
ফরাসি বিচারক নিকোলা গিউ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মামলায় প্রধান বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এখন মার্কিন কোম্পানিগুলো তাঁকে কোনো সেবা দিতে পারে না। অনলাইনে কেনাকাটা, হোটেল বুকিং বা যেকোনো ডিজিটাল লেনদেন তাঁর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। ইউরোপে থেকেও তিনি এই সমস্যা এড়াতে পারছেন না, কারণ বেশির ভাগ ডিজিটাল সেবা কোনো না কোনোভাবে মার্কিন কোম্পানির ওপর নির্ভর করে।
নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা শুধু গিউর ওপর পড়েনি। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেসকা আলবানেজের ইতালীয় ব্যাংক হিসাবও বন্ধ হয়ে গেছে। আইসিসির তৎকালীন প্রসিকিউটর করিম খানের ইমেইল সেবা মাইক্রোসফটের কাছ থেকে বন্ধ হয়েছিল বলে জানা যায়। এরপর আদালত তাদের ডিজিটাল ব্যবস্থা একটি ওপেন সোর্স বিকল্পে সরিয়ে নেয়। তবে মাইক্রোসফট বলছে, তারা আইসিসিকে সেবা বন্ধ বা স্থগিত করেনি।

আইসিসি কেন তৈরি হয়েছিল
আইসিসি ২০০২ সাল থেকে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও আগ্রাসনের অপরাধের বিচার করে আসছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি রুয়ান্ডা ও সাবেক যুগোস্লাভিয়ার গণহত্যার পর বিশ্ব সম্প্রদায় এই আদালত গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য ছিল, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যেন বড় অপরাধ করেও শাস্তি এড়াতে না পারেন।
আদালতের আইনি ভিত্তি রোম সনদ। যুক্তরাষ্ট্র এই সনদ অনুমোদনই করেনি, তাই আদালতের আইনের আওতায় তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পড়ে না। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিসি আজ পর্যন্ত কোনো মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগও আনেনি।
২০২৫ সালের নির্বাহী আদেশ থেকে শুরু
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ সই করেন। এই আদেশে আইসিসির বিচারক, কৌঁসুলি ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর নিষেধাজ্ঞার অনুমতি দেওয়া হয়। ট্রাম্প বলেন, আদালত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য করে অবৈধ ও ভিত্তিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে। তাঁর দাবি, এতে মার্কিন সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
ওই সময় আইসিসিতে ফিলিস্তিন পরিস্থিতির তদন্তই চলছিল। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ আদালত নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গালান্ত এবং হামাসের তিন নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। হামাসের ওই তিন নেতা পরে নিহত হয়েছেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র গাজা তদন্তে জড়িত কৌঁসুলি ও বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। একই সঙ্গে আলবানেজ এবং তিনটি ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনও নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ঢোকে।

এবার আদালতের প্রধানও তালিকায়
গত ১৮ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির প্রেসিডেন্ট, জাপানের বিচারক তোমোকো আকানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। সেনেগালের জ্যেষ্ঠ ট্রায়াল আইনজীবী আবদুলাই সেইও এই তালিকায় আছেন। আকান ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আদালতের প্রেসিডেন্ট। এই নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের সম্পদ জব্দ হবে এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের সঙ্গে লেনদেন করতে পারবে না।
রুবিও বলেছেন, এই দুজন এমন দেশের কর্মকর্তাদের তদন্ত, গ্রেপ্তার বা বিচারের চেষ্টায় সরাসরি যুক্ত, যে দেশ আইসিসির এখতিয়ার মানেনি। তবে তিনি কোনো উদাহরণ দেননি। আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত এক ডজনের বেশি আইসিসি বিচারক ও কৌঁসুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর ফলে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং তাঁরা আন্তর্জাতিক ব্যাংকব্যবস্থা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
আইনজ্ঞদের সমালোচনা
জার্মান ফৌজদারি ও আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞ কাই আমবস এই নিষেধাজ্ঞার কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও ন্যায়বিচারের কাজের ওপর মৌলিক আঘাত। তিনি বলেন, স্বাধীন কৌঁসুলি ও বিচারকদের এখন সন্ত্রাসী, সংগঠিত অপরাধী ও দুর্নীতিবাজ স্বৈরশাসকদের সমান চোখে দেখা হচ্ছে।
আমবসের বিশ্লেষণ হলো, আদালতের তদন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের দিকে ঘুরলে ওয়াশিংটনের আপত্তি থাকে না। যেমন তালেবান বা হামাসের ক্ষেত্রে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা তার বন্ধুদের ওপর আইন প্রয়োগের কথা উঠলেই আদালতকে শত্রু বানানো হয়।
আরেকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণত জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা শান্তি রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করে। এখন একটি দেশ সেই একই হাতিয়ার দিয়ে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারকে দুর্বল করছে।
আদালতে লড়াই
নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই মামলা চলছে।
- ১১ আগস্ট আমেরিকান ফ্রেন্ডস সার্ভিস কমিটি, সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউট নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞা বাক স্বাধীনতা ও সংগঠনের স্বাধীনতাসহ সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে। তারা বলছে, এর ফলে তারা নিজেদের মানবাধিকার ও আইনি কাজ কমাতে বাধ্য হয়েছে। (কিছু সংবাদমাধ্যম মামলার তারিখ ভিন্নভাবে লিখেছে। এই প্রতিবেদনে সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটসের বিবৃতির তারিখ ধরা হয়েছে।)
- এর আগে জুনে তিনজন নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত আইসিসি বিচারক একই আদালতে মামলা করেছেন।
- জুলাইয়ে ফিলিস্তিনি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা দুটি মার্কিন সংগঠনও মামলা করেছে।
- ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক ও মেইনের ফেডারেল আদালত বলেছে, এই নির্বাহী আদেশ প্রথম সংশোধনী লঙ্ঘন করে। সংশ্লিষ্ট মামলার বাদীদের ক্ষেত্রে আদালত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করেছে।
- সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফেডারেশনসহ ৩৮টি সংগঠন আদালতে মামলার পক্ষে মতামতপত্র জমা দিয়েছে। মামলাটি এখনো বিচারাধীন এবং চূড়ান্ত রায় আসেনি।
ইউরোপীয় সাংবিধানিক ও মানবাধিকার কেন্দ্রের (ইসিসিএইচআর) কর্মকর্তা আন্দ্রেয়াস শুলার বলেছেন, রুবিও যখন আদালতকে ইট ইট করে ভাঙার কথা বলছেন, তখন আন্তর্জাতিক আইনকেও ইট ইট করে রক্ষা করতে হবে। তাঁর মতে, স্বৈরাচারী ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক সাহস ও আইনের শাসনের সততাই একমাত্র শক্তি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব
আদালতের কাজ ধীরতাঃ আদালতের কর্মীরা ব্যাংক ও ডিজিটাল সেবা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে মামলার কাজে মন দেওয়া কঠিন হয়। করিম খানের ইমেইল সেবা বন্ধ হওয়ার পর আদালত ডিজিটাল ব্যবস্থা ওপেন সোর্সে সরিয়েছে। মাইক্রোসফট অবশ্য বলছে, তারা সেবা বন্ধ করেনি। তবু এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, আদালতের কাজ বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর কতটা নির্ভর করে।
সদস্য দেশ ছেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি। বার্তা সংস্থা ও আইনজীবীদের লেখা থেকে জানা যায়, মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার আদালত ছাড়ার নোটিস দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা ও চাদও একই পথে গেছে বলে একজন প্যারিসের ফৌজদারি আইনজীবী লিখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র নাকি বলেছেন, আরও দেশ এ পথে গেলে তারা স্বাগত জানাবে। তবে রোম সনদ অনুযায়ী নোটিস দেওয়ার এক বছর পর প্রত্যাহার কার্যকর হয়। হাঙ্গেরি আগে নোটিস দিয়েছিল। পরে নতুন সরকার আসার পর দেশটির সংসদ আদালতের সদস্য থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছে। আদালত ১ জুন ২০২৬ তা জানিয়েছে। অর্থাৎ নোটিস দিলেই বিদায় নিশ্চিত হয় না।
ইউরোপের এক্সিট ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য দেশ আইসিসির সদস্য। ফ্রান্সের এক আইনজীবীর মতে, ফ্রান্সে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানতে বাধ্যতা নেই, বরং ইউরোপীয় ব্লকিং আইন ও আদালতকে সহযোগিতার আইনি দায় বহাল আছে। ফন ডার লায়েন ও কস্তা প্রকাশ্যে আদালতকে সমর্থন জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, ইউরোপ কথার বাইরে কতটা কাজ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা: মামলাগুলোর রায় বড় প্রভাব ফেলবে। ৩৮টি সংগঠন বাদীদের পক্ষে মতামতপত্র দিয়েছে। রায় নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনকে নীতি বদলাতে হতে পারে।
সামনে কী
নিষেধাজ্ঞা শিগগির শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং তালিকা লম্বা হচ্ছে। আদালতের ভাগ্য এখন অনেকটাই নির্ভর করছে মার্কিন আদালতের রায় এবং আইসিসির সদস্য দেশগুলোর অবস্থানের ওপর। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বিচারক ও কৌঁসুলিরা ততদিন ব্যাংক হিসাব, ডিজিটাল সেবা ও দৈনন্দিন লেনদেনের সমস্যা নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

