দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে আজ রোববার সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন নাগরিকেরা। প্রেসিডেন্ট পদে মূল লড়াই বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও বামপন্থি নেতা লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ট্রাম্পপন্থি সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যে। এই নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নিয়েও আলোচনা চলছে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠেছে।
ট্রাম্প বামপন্থিদের ‘পাগল কমিউনিস্ট’ বলে মনে করেন। ব্রাজিলের এই নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ একজন বামপন্থি নেতা। তাই অনেকে এই ভোটকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য আরেকটি পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন।
চার বছর আগের নির্বাচনে লুলা অল্প ব্যবধানে জইর বলসোনারোকে হারিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনের পরের সময়টি ছিল অত্যন্ত উত্তাল। জইর বলসোনারোর হাজার হাজার সমর্থক ব্রাজিলের কংগ্রেসে হামলা চালান। পরে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন জইর বলসোনারো। সেই ঘটনার ছাপ দেশের রাজনীতিতে এবং এবারের নির্বাচনেও রয়ে গেছে।
৭১ বছর বয়সী জইর বলসোনারো ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি এবার প্রার্থী হতে পারছেন না। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করায় তিনি ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। নানা শারীরিক সমস্যার কারণে এখন কারাগারে না থেকে গৃহবন্দি আছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা বা প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার ওপরও তাঁর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
তবু নির্বাচনে তাঁর উপস্থিতি জোরালো। ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রচারণার শুরুতে একটি ভিডিও দেখানো হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি জইর বলসোনারোর একটি প্রতিকৃতি সেখানে ছেলের প্রার্থিতাকে সমর্থন জানায়।
প্রেসিডেন্ট পদে মোট ১২ জন প্রার্থী লড়ছেন। তবে জনমত জরিপে মাত্র দুজনের সমর্থন দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছেছে। তাঁরা হলেন লুলা ও ফ্লাভিও বলসোনারো। বিবিসি ব্রাজিলের জরিপ অনুযায়ী, দুজনেরই জনপ্রিয়তা ৪০ শতাংশের আশপাশে। লুলা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। বাকি ১১ জন প্রার্থীর প্রত্যেকের সমর্থন ৪ শতাংশ বা তার কম।
আজ প্রথম দফায় কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি বৈধ ভোট না পেলে শীর্ষ দুজনকে নিয়ে ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোট হবে। জরিপ বলছে, দ্বিতীয় দফা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে অনেক ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষেও ৯ শতাংশ ভোটার ঠিক করতে পারেননি কাকে ভোট দেবেন। কেউ কেউ ব্যালট নষ্ট করবেন, ফাঁকা রাখবেন বা ভোটকেন্দ্রেই যাবেন না বলে ঠিক করেছেন। তাই প্রথম দফাতেই কারও জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জরিপ সাধারণত কয়েক হাজার মানুষের মতামতের ওপর ভিত্তি করে হয়। ফলে আসল ফল জরিপের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশ আলাদা হতে পারে।
ব্রাজিলে ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সীরা ভোট দিতে পারেন। ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়সী শিক্ষিত নাগরিকদের জন্য ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক। ভোট না দিলে জরিমানা গুনতে হয়। এবার প্রায় ১৬ কোটি মানুষ ভোট দেবেন।
বামপন্থি ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী লুলার বয়স ৮০ বছর। চলতি মাসের শেষে তিনি ৮১ বছরে পা রাখবেন। এর আগে তিনি তিনবার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় ছিলেন। তখন ‘বোলসা ফামিলিয়া’ নামের নগদ অর্থ সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে লাখো মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলার জন্য তিনি প্রশংসিত হন। শ্রমিক থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া এই নেতা ক্ষমতা ছাড়ার সময় ৮০ শতাংশেরও বেশি জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিলেন।
পরে তাঁর দলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সাল থেকে ১৮ মাসের বেশি সময় তিনি জেল খেটেছেন। অভিযোগ তিনি বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন। ২০২১ সালে সেই দুর্নীতির রায় বাতিল হলে ২০২২ সালের নির্বাচনে লড়ার সুযোগ পান তিনি। সেই নির্বাচনে ১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে জইর বলসোনারোকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হন লুলা। তৃতীয় মেয়াদের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, এটাই তাঁর শেষবার। তবু এ বছর তাঁর দল তাঁকেই আবার প্রার্থী করেছে।
২০২২ সালের নির্বাচনের আগে সমর্থকেরা তাঁকে ‘আমাজনের রক্ষক’ বলে ডাকতেন। সম্প্রতি অবশ্য পরিবেশবাদীরা তাঁর সমালোচনা করছেন। বিশেষ করে আমাজন নদীর মোহনার কাছে সমুদ্রতীরে তেল উত্তোলনের চেষ্টার কারণে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছেন। লুলা বলছেন, তিনি ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তেল বিক্রির আয় দিয়েই ব্রাজিলকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির পথে নেওয়া সম্ভব বলে তাঁর দাবি।
লুলা সরকারের দাবি, তাদের নীতি কাজ করছে। এর প্রমাণ হিসেবে তারা আমাজনে বন উজাড় কমে যাওয়ার কথা বলছে। স্যাটেলাইট চিত্র বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আমাজনের যতটা অংশ উজাড় হয়েছে, তা গত ১০ বছরে সবচেয়ে কম।
লুলার এই মেয়াদে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুব ভালো যায়নি। ট্রাম্প প্রশাসন ‘ডনরো ডকট্রিন’ মেনে চলার কথা বলছে। ট্রাম্পের নামে এই মতবাদের নামকরণ। এর মূল কথা হলো, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা নিয়ে গঠিত পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যে অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করবে না। জবাবে লুলা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ব্রাজিল কারও বাড়ির পেছনের বাগান নয় যে যে কেউ চাইলেই নিয়ন্ত্রণ করবে।
ব্রাজিলের বর্তমান নেতা রাশিয়া ও চীনকে নিয়ে গড়ে ওঠা বহুজাতিক সংগঠন ব্রিকসকে এগিয়ে নিতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, ব্রিকস শক্তিশালী হলে তা ওয়াশিংটনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে। তাই ফ্লাভিও বলসোনারোকে যাঁরা সমর্থন দিচ্ছেন, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সেই অংশের দিকে ইঙ্গিত করে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন লুলা। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রের কোনো দেশি বা বিদেশি শত্রু নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করলে তা তিনি মেনে নেবেন না।
অন্যদিকে ৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও বলসোনারো ২০১৯ সাল থেকে সিনেটর। এবার তিনি ডানপন্থি লিবারেল পার্টির প্রার্থী। বাবার তুলনায় তাঁকে কিছুটা শান্ত মনে হলেও তিনি মূলত বাবার আদর্শ মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েই অনুসারীদের ভোট টানার চেষ্টা করছেন।
পেশায় আইনজীবী ফ্লাভিও সিনেটে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি অপরাধীদের সাজা বাড়ানো এবং বন্দুক আইন শিথিল করার পক্ষে। তাঁর বক্তব্য, অপরাধীদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষার অধিকার সৎ নাগরিকদের থাকা উচিত। ব্রাজিলের অপরাধী গোষ্ঠী কোমান্দো ভেরমেলো ও পিইসিসিকে মার্কিন সরকারের মাধ্যমে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করানোর পেছনেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। লুলার সরকার অবশ্য এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিল।
প্রচারণায় ফ্লাভিও ইসরায়েলপন্থি রক্ষণশীল খ্রিষ্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং বড় কৃষি ব্যবসায়ীদের সমর্থন পেতে বিশেষ নজর দিচ্ছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে কৃষকদের ওপর থেকে বাড়তি সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমাবেন। তাঁর ভাষায়, কৃষকদের ওপর থেকে রাষ্ট্রের বোঝা নামাতে যা যা দরকার, তিনি তা-ই করবেন।
গত আগস্টে গ্লোবো টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ২০১৯ সালে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করেছিলেন, এখনো কি একই অবস্থানে আছেন। জবাবে তিনি বলেন, এখন চরম জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে। তবে তাঁর মতে, এগুলো মূলত প্রাকৃতিক চক্রের অংশ।
ফ্লাভিও নিজেকে ট্রাম্পের বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে তুলে ধরতে তৎপর। গত মে মাসে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি তা প্রমাণের চেষ্টা করেন। সম্প্রতি তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জিতলে ট্রাম্প প্রশাসনের নেতৃত্বাধীন অপরাধবিরোধী জোট ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’-এ ব্রাজিলকে যুক্ত করবেন।
কয়েক মাস আগেও ভোটারদের কাছে অপরাধ ও নিরাপত্তা ছিল সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে একটি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে এখন দুর্নীতি আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে। ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম বড় এই জালিয়াতির কেন্দ্রে আছেন কারাবন্দি ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারো। দেশটির ডান ও বাম, দুই শিবিরের প্রভাবশালীদের সঙ্গেই তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর বাবার জীবনের ওপর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ভোরকারোর কাছে অর্থ চেয়েছিলেন। এ-সংক্রান্ত কয়েকটি অডিও ফাঁস হওয়ার পর তিনি তা স্বীকারও করেছেন। ফাঁস হওয়া অডিওতে তাঁকে ১৩ কোটি ৪০ লাখ রিয়াল, অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার চেয়ে অনুরোধ করতে শোনা যায়। এরপর চলচ্চিত্রটির অর্থায়নে দুর্নীতির অভিযোগে ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
জনমত জরিপ বলছে, এই কেলেঙ্কারিতে শুধু ফ্লাভিও নন, লুলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারণ ওই ব্যাংকারের সঙ্গে লুলার ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েসের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। মোরায়েস জইর বলসোনারোর বিচারের প্রধান বিচারক ছিলেন। তাঁর কারাবাসের শর্ত নিয়েও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন তিনি।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ভোরকারো এমন একটি ফোন নম্বরে অনেকবার কল ও বার্তা পাঠিয়েছেন, যা মোরায়েসের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, ওই ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তির কাছে ভোরকারো গ্রেপ্তার এড়াতে সাহায্য চেয়েছিলেন। মোরায়েস কোনো অন্যায়ের কথা অস্বীকার করেছেন। তবে এই তথ্য ফাঁস হওয়ায় নির্বাচনের ঠিক আগে জনদৃষ্টি ফ্লাভিওর অভিযোগ থেকে সরে বিচারপতির দিকে ঘুরে গেছে।
লুলা নিজেকে এই বিতর্ক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছেন। তিনি বলছেন, আইনের চেয়ে বড় কেউ নয়। কিন্তু ফ্লাভিও ইস্যুটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছেন। এক নির্বাচনী সভায় সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, লুলাকে ভোট দেওয়া মানেই মোরায়েসকে ভোট দেওয়া। মোরায়েসের ওপর ডানপন্থিদের যে প্রচণ্ড ক্ষোভ আছে, তা কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের ভোট বাড়াতে চাইছেন।

