যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের জন্য পরিস্থিতি ততটাই কঠিন হয়ে উঠছে। নির্বাচনের মাত্র চার সপ্তাহ আগে এমন কিছু আসন রক্ষার লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে রিপাবলিকানদের, যেগুলো আগে নিরাপদ বলে মনে করা হতো।
ট্রাম্প নিজেই ভোটারদের দল থেকে দূরে না সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন এবং অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে। তবে নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে প্রকাশিত জরিপ চূড়ান্ত ফলাফলের নিশ্চয়তা দেয় না। অতীতে ট্রাম্পের সমর্থকদের শেষ মুহূর্তের সক্রিয়তা অনেকবার রাজনৈতিক হিসাব বদলে দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করছে, তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র একটি অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতির পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি এটিকে দেশের “সোনালি যুগ” হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা।
হোয়াইট হাউসের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের পরিচালক কেভিন হাসেট বলেছেন, কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জরিপে ভোটারদের আর্থিক দুরবস্থার চিত্র অতিরঞ্জিতভাবে দেখানো হচ্ছে। তার দাবি, অর্থনীতি নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের বক্তব্য, প্রশাসন সাধারণ মানুষের সমস্যাকে স্বীকার করতে চাইছে না। অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলি বলেছেন, অনেক মানুষ বর্তমানে নিজেদের দৈনন্দিন খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং ট্রাম্পের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মূল সমস্যার সমাধান নয়।
রিপাবলিকান সিনেটর জন কেনেডিও স্বীকার করেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। তার মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দুটোই কাজ করছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপেও অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। সিবিএস নিউজের জরিপে ৭০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ট্রাম্পের নীতির কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। একই জরিপে ৫৬ শতাংশ ভোটার বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন, যেখানে মাত্র ২০ শতাংশ সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে দায়ী করেছেন।
অন্যদিকে, এপি/এনওআরসি জরিপে ৬৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ভোটার জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় ট্রাম্পের কার্যক্রম তাদের প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ হয়েছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প লাতিনো ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিলেন। এই অগ্রগতি রিপাবলিকান কৌশলবিদদের মধ্যে এমন আশা তৈরি করেছিল যে এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদে দলটির দিকে ঝুঁকতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রবণতায় পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি ও ব্যাপক বহিষ্কার কার্যক্রম নিয়ে অনেক লাতিনো ভোটারের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
একটি নতুন জরিপে দেখা গেছে, লাতিনো ভোটাররা ২৪ শতাংশ ব্যবধানে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় দেখতে চান। একই জরিপে মাত্র ২৭ শতাংশ লাতিনো ভোটার ট্রাম্পের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেছেন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তার ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ২০ শতাংশ।
টেক্সাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে এই ভোট পরিবর্তন বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো দীর্ঘ সময় পর রাজ্যব্যাপী বিজয়ের সম্ভাবনা তৈরি করছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
একসময় রিপাবলিকানদের জন্য সুবিধাজনক মনে হওয়া সিনেটের নির্বাচনী চিত্র এখন অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা কয়েকটি আসন পরিবর্তনের মাধ্যমে কংগ্রেসের ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সুযোগ দেখছে।
নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনার সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত আলাস্কা ও টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। একই সঙ্গে ওহাইও, কানসাস ও আইওয়ার মতো রাজ্যেও প্রতিযোগিতা খুব ঘনিষ্ঠ অবস্থায় রয়েছে।
এই রাজ্যগুলোর প্রতিটিতেই ২০২৪ সালে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে অর্থনীতি নিয়ে তার জনপ্রিয়তা অনেক জায়গায় ৪০ শতাংশ বা তার নিচে রয়েছে।
মিশিগান ও মেইনের মতো রাজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ অবসর নিতে যাওয়া সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে মেইনে ডেমোক্র্যাটরা দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে হারানোর আশা করছে।
ট্রাম্প নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে তার প্রচারণা জোরদার করেছেন। তিনি আলাবামার মতো শক্তিশালী রিপাবলিকান ঘাঁটিতে সমাবেশ করেছেন এবং ওহাইওতে প্রচারণা চালিয়েছেন, যেখানে তিনি ২০২৪ সালে ১১ পয়েন্ট ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।
তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, তারা যেন তাকে ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবেই বিবেচনা করেন। ট্রাম্প দাবি করছেন, তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র নতুন উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
ভোটারদের আকৃষ্ট করতে হোয়াইট হাউস প্রায় ২ কোটি মেডিকেয়ার পার্ট বি সুবিধাভোগী প্রবীণ নাগরিককে ৯০ ডলার করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানকে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি ট্রাম্পের বার্তায় বিভিন্ন বিষয়ও উঠে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি রিপাবলিকান নেতাদের সঙ্গে বিতর্ক, গণমাধ্যমের সমালোচনা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। এবারও ভোটারদের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক বিভাজন বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা এই নির্বাচনকে ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যক্রমের ওপর এক ধরনের মূল্যায়ন হিসেবে তুলে ধরছে। তারা যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম নিয়ে আরও বিস্তৃত তদন্তের সুযোগ পেতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্প তার সমর্থকদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন এবং দাবি করছেন, তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র উন্নতির নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর—ভোটাররা কি ট্রাম্পের ঘোষিত উন্নতির ভবিষ্যৎকে বিশ্বাস করবেন, নাকি নিজেদের বর্তমান অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন।

