কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় নতুন একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই উদ্যোগের নাম দিয়েছেন ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ (এসআইএফ)। নতুন এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রকে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নেতৃত্বে রাখা এবং সরকারি সংস্থা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটনকে এই টাস্কফোর্সের প্রধান করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ভোক্তা সংগঠন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর যোগাযোগ ও সহযোগিতা নিশ্চিত করাই হবে এই বাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব।
নতুন টাস্কফোর্সে ফেডারেল ট্রেড কমিশনের চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু ফার্গুসন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও প্রকৌশলবিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি এমিল মাইকেল এবং অফিস অব পারসোনেল ম্যানেজমেন্টের পরিচালক স্কট কুপারও যুক্ত থাকবেন। এই কমিটি সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের কাছে প্রতিবেদন দেবে।
ট্রাম্পের এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রশাসনিক কমিটি গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নাম পরিবর্তনের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তও। গত ২৯ সেপ্টেম্বর এক নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি যোগাযোগে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা এআই শব্দের পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা এসআই ব্যবহারের নির্দেশ দেন তিনি।
এই নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি চিঠিপত্র, ওয়েবসাইট, প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক নথিতে এআই শব্দের পরিবর্তে এসআই ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্পের যুক্তি হলো, ‘আর্টিফিশিয়াল’ শব্দটি প্রযুক্তিটিকে কৃত্রিম বা নকল হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ সাধারণত মানুষের সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এক ধরনের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিকে বোঝায়। ফলে বর্তমান এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই শব্দ ব্যবহার বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক অবশ্য ট্রাম্পের নতুন পরিভাষাকে সমর্থন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার এআই প্ল্যাটফর্মের নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেসএক্সএসআই’ করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং তিনি এটিকে একটি সুপার ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
নতুন এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে থাকা জে ক্লেটন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি দেশটির ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল প্রসিকিউটর এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এআই প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনায় ক্লেটন এর আগে এটিকে একই সঙ্গে বড় সুযোগ এবং সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার মতে, কোনো প্রযুক্তি যখন একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করে, তখন সেটিকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন কিছু আইনপ্রণেতা, তবে এআই নিরাপত্তা নিয়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস-চেয়ার মার্ক ওয়ার্নার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে চীনসহ অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে উন্নত এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং কঠোর পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে এআই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন ধরনের আলোচনা চলছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে এআইয়ের সম্ভাবনার কথা বলছে, অন্যদিকে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরছে।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান সম্প্রতি বলেছেন, এআইয়ের সম্ভাব্য সুবিধা এত বড় যে কিছু ঝুঁকি গ্রহণ করেও প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত এআই খাতে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এর আগে এআই উন্নয়ন তদারকিতে একজন ‘এআই জার’ এবং একটি আলাদা এআই ফোর্স গঠনের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছিল প্রশাসন।
এ ছাড়া হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা একটি এআই চুক্তিতে সই করেন। এতে প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ ও বাইরের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এআই এখন শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন এআই উন্নয়নকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।
তবে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ গঠনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এআই নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও উদ্ভাবনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিকে অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রতিরক্ষায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে তথ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্ব প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার এই সময়ে ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু গবেষণাগারের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

