তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধ গাজার মানুষের জীবনকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যার প্রভাব শুধু ধ্বংস হওয়া ভবন বা অবকাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সবকিছুতেই গভীর পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে ঘর, স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার ছিল স্বাভাবিক জীবনের অংশ, সেখানে এখন অনেক মানুষের কাছে বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর শুরু হওয়া দীর্ঘ সংঘাত গাজার প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ধারাবাহিক হামলা, বাস্তুচ্যুতি এবং অবরোধের কারণে পুরো ভূখণ্ডের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময়ে ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হলেও তা মানুষের দুর্ভোগ পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি। যুদ্ধবিরতির পরও হামলা ও সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আজকের গাজায় স্বাভাবিক জীবনের সবচেয়ে সাধারণ বিষয়গুলোও অনেক মানুষের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। একটি নিরাপদ ঘর, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা সহজে চলাচলের সুযোগ—এসব মৌলিক সুবিধা বহু পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষ জরুরি আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল, কারণ তারা হামলা বা উচ্ছেদের কারণে নিজেদের ঘর হারিয়েছে।
পানি সংকট গাজার মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রামের অন্যতম বড় অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবারকে দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপদ পানির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে ৯১ শতাংশ পর্যবেক্ষণ করা পরিবার মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার পানির সংকটে ছিল। এর আগে জুনে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশ।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। গাজায় কার্যকর বিদ্যুৎ গ্রিড না থাকায় হাসপাতাল, জরুরি সেবা এবং সাধারণ মানুষকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি, তেল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকট এই বিকল্প ব্যবস্থাকেও কঠিন করে তুলেছে। ধ্বংস হওয়া রাস্তা ও যোগাযোগ অবকাঠামোর কারণে মানুষের চলাচল, ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার এবং জরুরি সেবা পাওয়াও আরও কঠিন হয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে গাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন বেঁচে থাকার পরিকল্পনাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। পানি সংগ্রহ, মোবাইল চার্জ করা, খাবার রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কিংবা চিকিৎসা পাওয়ার মতো কাজগুলো এখন আগের মতো স্বাভাবিক নয়; প্রতিটি কাজের জন্য সময়, সম্পদ এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন হচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপে গাজার অর্থনীতি
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি পড়েছে গাজার অর্থনীতিতে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় শিল্প এবং উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় মানুষের আয় কমেছে এবং ক্রয়ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে বেকারত্ব বেড়ে ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থনৈতিক পতনের মাত্রা বোঝা যায় মাথাপিছু আয়ের পরিবর্তন থেকে। ২০২৫ সালে গাজার মাথাপিছু জিডিপি নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২১২ ডলারে, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ। কৃষি ও শিল্প উৎপাদনও ভয়াবহভাবে কমে গেছে। কৃষি ও শিল্প খাত তাদের ২০২২ সালের উৎপাদনের মাত্র ৬ শতাংশ পর্যায়ে নেমে এসেছে, আর নির্মাণ খাত প্রায় ধসে পড়ে ১ শতাংশে অবস্থান করছে।
কর্মসংস্থান হারিয়ে যাওয়ায় বহু পরিবার এখন মানবিক সহায়তা, ঋণ এবং ছোট পরিসরের অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভর করছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ গাজার সমাজকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে। অনেক মানুষ আবার পুরোনো পেশায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে কিংবা সীমিত সম্পদ দিয়ে নতুন ধরনের কাজ তৈরি করার চেষ্টা করছে।

হারিয়ে যাচ্ছে একটি প্রজন্মের শিক্ষা
যুদ্ধ গাজার শিক্ষা ব্যবস্থাকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কয়েক লাখ শিশু প্রায় তিন বছর ধরে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারেনি। অনেক স্কুল ধ্বংস হয়েছে, আর যেগুলো টিকে আছে তার অনেকগুলোই বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা প্রায় তিন বছর নিয়মিত শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আরও প্রায় ২ লাখ শিশু কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না।
এই দীর্ঘ বিরতি শুধু বর্তমান শিক্ষাজীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, ভবিষ্যতের জন্যও বড় সংকট তৈরি করছে। দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে থাকার কারণে শিশুদের মৌলিক দক্ষতা কমে যাচ্ছে এবং একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষাগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা
গাজার স্বাস্থ্য খাত যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত্রগুলোর একটি। হাসপাতালগুলোতে রোগী সামলানোর সক্ষমতা কমে গেছে, একই সঙ্গে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জ্বালানি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৩৬টি হাসপাতালই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু আছে, কিন্তু কোনো হাসপাতালই পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না।
ক্যানসার চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের চিকিৎসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। গাজার বাইরে চিকিৎসার সুযোগও সীমিত। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে বাইরে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হলেও আরও বহু মানুষ বিশেষায়িত চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। অপর্যাপ্ত আশ্রয়, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমান স্বাস্থ্য অবকাঠামো এই বাড়তি ঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।

সংকুচিত হয়ে গেছে মানুষের বসবাসের জায়গা
যুদ্ধ গাজার ভৌগোলিক বাস্তবতাকেও বদলে দিয়েছে। সামরিক নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে মানুষের বসবাসের জায়গা ক্রমেই ছোট হয়ে এসেছে। অনেক মানুষ নিজেদের বাড়ি, কৃষিজমি এবং প্রয়োজনীয় স্থাপনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশ সীমাবদ্ধতার আওতায় ছিল। এর ফলে দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ গাজার ৩০ শতাংশেরও কম এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে।
রাফাহ শহর এই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ। যুদ্ধের সময় এটি গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহতে সামরিক অভিযানের কারণে ৮ লাখের বেশি মানুষ স্থানান্তরিত হয় বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে গাজা
তিন বছরের যুদ্ধ গাজার মানুষের সামনে শুধু ধ্বংস নয়, ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে, জনসেবা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্মের ওপর নয়, আগামী বহু বছর ধরে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অনুভূত হবে। ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, শিক্ষা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, স্বাস্থ্য খাত সচল করা এবং মানুষের জীবিকা ফিরিয়ে আনা হবে বিশাল চ্যালেঞ্জ।
গাজার মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা নয়; বরং যুদ্ধ শেষে তারা কীভাবে আবার একটি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে, সেটিই মূল বিষয়। তিন বছরের সংঘাত একটি ভূখণ্ডকে শুধু ধ্বংস করেনি, বদলে দিয়েছে সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের পথ।

