গাজা যুদ্ধের তিন বছর পার হলেও সংঘাত, মানবিক সংকট এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। একই সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কোন ঘটনা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, পশ্চিমা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় গণমাধ্যম অনেক সময় ইসরায়েলিদের নিরাপত্তা ও উদ্বেগকে বেশি গুরুত্ব দেয়, কিন্তু ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সংকটকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে।
সম্প্রতি ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটকে ঘিরে ব্যাপক সংবাদ প্রচার হয়েছে। ওই ঘটনায় কোনো ইসরায়েলি যাত্রী আহত হননি। বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে এবং সৌদি চিকিৎসকরাও ইসরায়েলি যাত্রীদের পরীক্ষা করে তাদের নিরাপদ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কিন্তু এরপরও ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক টেলিভিশন নেটওয়ার্কে বড় খবর হিসেবে প্রচারিত হয়। ইসরায়েলি যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে। সমালোচকদের প্রশ্ন, যেখানে কোনো প্রাণহানি হয়নি, সেখানে এত বড় সংবাদ গুরুত্ব দেওয়া হলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতা ও মৃত্যুর ঘটনাগুলো কেন একই মাত্রার গুরুত্ব পায় না।
একই সময়ে পশ্চিম তীরে কয়েকটি সহিংস ঘটনার খবর আসে। ১ অক্টোবর রামাল্লার কাছে ইয়াসুফ গ্রামের এলাকায় ৫১ বছর বয়সী মাশুর ইয়াসিন নিহত হন। পরদিন কোবার গ্রামে ১৯ বছর বয়সী বাহা সামি আমিন আল-নাৎশেহ নিহত হন। এছাড়া পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস, জলপাই গাছ কেটে ফেলা এবং কৃষকদের ওপর হামলার অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি মৌসুমে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলা, জমি দখল এবং গাছ ধ্বংসের ঘটনা স্থানীয় মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। সমালোচকদের মতে, এসব ঘটনা অনেক সময় আন্তর্জাতিক সংবাদে সামান্য জায়গা পায়।
এই বৈপরীত্যের বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো অনেক সময় বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখানো হয়, অন্যদিকে ইসরায়েলিদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্বেগ দ্রুত বড় আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। সমালোচকদের দাবি, এই ধরনের সংবাদ উপস্থাপন মানুষের মধ্যে একটি অসম ধারণা তৈরি করে, যেখানে এক পক্ষের কষ্ট বেশি দৃশ্যমান হয় এবং অন্য পক্ষের কষ্ট আড়ালে থেকে যায়।
গাজায় গত তিন বছরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিহত, আহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার সংকট গভীর হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
চিকিৎসা সহায়তা, ওষুধ, হাসপাতালের সরঞ্জাম এবং পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে। এর ফলে আহত ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। যুদ্ধের কারণে গাজার সাধারণ মানুষ শুধু বোমা হামলার শিকার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও মানবিক সংকটের মধ্যেও আটকে পড়েছে।
যুদ্ধবিরতি বা শান্তি উদ্যোগের আলোচনা চললেও বাস্তবে সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গাজায় বিভিন্ন সময়ে হামলায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর খবর এসেছে। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষও রয়েছেন। ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের মৃত্যুর ঘটনাও আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো সব পক্ষের মানুষের জীবন ও দুর্ভোগকে সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা। কিন্তু যদি কোনো পক্ষের মৃত্যু বা কষ্ট বারবার আড়ালে থেকে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক জনমতও অসমভাবে গড়ে উঠতে পারে।
তবে বিষয়টি শুধু গণমাধ্যমের নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি এবং শক্তির ভারসাম্যও জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ইসরায়েল নীতি, মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা—সবকিছু মিলিয়ে গাজা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তিন বছর পরও গাজার বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত নয়; এটি একটি গভীর মানবিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক সংকট। একটি পক্ষের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্য পক্ষের জীবন, মর্যাদা ও মানবাধিকারের মূল্যও সমান। তাই বড় প্রশ্ন এখন শুধু যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা নয়; বরং বিশ্ব সম্প্রদায় কীভাবে এমন একটি সমাধান খুঁজবে, যেখানে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি উভয় জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হয়।
মিডল ইস্ট মনিটরে ছাপানো জামাল কাঞ্জ-এর মতামতের আলোকে প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে।

