রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া সংকটের কারণে মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে। দীর্ঘদিন ধরে রুশ তেল ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এখন ইরানের কাছ থেকে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য আমদানির সম্ভাবনা দেখছে। এতে নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি সংকটে থাকা ইরানের জন্য নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার বেশ কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটিতে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর ওপর, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি পেয়ে আসছিল।
তাজিকিস্তান ইতোমধ্যে ইরান থেকে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য নেওয়া শুরু করেছে। আগস্টে দেশটির জ্বালানি ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, রাশিয়ার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা ইরানের কাছ থেকে জ্বালানি আমদানি করছে। দেশটি ইরান থেকে প্রায় ২৫ লাখ ৫০ হাজার টন তেল ও জ্বালানি পণ্য নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
একই সময়ে কিরগিজস্তানেও ইরানের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার আলোচনা এগিয়েছে। আগস্টে দেশটির সঙ্গে যৌথভাবে একটি তেল শোধনাগার স্থাপনের প্রস্তাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্মতি জানান। প্রস্তাব অনুযায়ী, শোধনাগারের জন্য প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করবে ইরান এবং উৎপাদিত পণ্য দুই দেশ ভাগ করে নেবে।
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তান সবচেয়ে বেশি রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তাজিকিস্তানের মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ আগে রাশিয়া থেকে আসত। অন্যদিকে কিরগিজস্তানের পেট্রোলের ৯০ শতাংশের বেশি রুশ উৎস থেকে সরবরাহ করা হতো।
তবে কাজাখস্তানের নিজস্ব তিনটি বড় তেল শোধনাগার থাকলেও দেশটিতে জ্বালানির দাম বেড়েছে। চলতি বছরে দেশটিতে জ্বালানির দাম প্রায় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। উজবেকিস্তান তুলনামূলকভাবে কম রুশ নির্ভরশীল হলেও আঞ্চলিক চাহিদা বাড়ায় তারা জর্জিয়া ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন জ্বালানি চুক্তি করছে।
রাশিয়ার জ্বালানি সংকটের মূল কারণ ইউক্রেনের ড্রোন হামলা। এসব হামলায় রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়া অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি সীমিতকরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
এই পরিস্থিতি ইরানের জন্য কিছুটা সুযোগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য বাধার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। দেশটির তেল বিক্রির প্রধান বাজারগুলো সীমিত হয়ে যাওয়ায় নতুন ক্রেতা খুঁজছে তেহরান। রাশিয়ার সাময়িক জ্বালানি ঘাটতি সেই সুযোগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মধ্য এশিয়ার বাজার ইরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প হয়ে উঠবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো পরিবহন ব্যবস্থা। ইরান থেকে তাজিকিস্তান বা কিরগিজস্তানে তেল পাঠাতে হলে তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের মধ্য দিয়ে রেলপথ ব্যবহার করতে হবে। বিপরীতে রাশিয়ার সঙ্গে এসব দেশের সরাসরি সীমান্ত, পাইপলাইন ও দীর্ঘদিনের সরবরাহ ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের হামলা কমে গেলে বা রাশিয়া দ্রুত তাদের শোধনাগার পুনরুদ্ধার করতে পারলে মধ্য এশিয়ায় রুশ জ্বালানির অবস্থান আবার শক্তিশালী হতে পারে। রাশিয়া এখনো এসব দেশের জন্য ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে সুবিধাজনক সরবরাহকারী।
এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, ইরানি তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে মধ্য এশিয়াকে রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করায় সরাসরি বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা সীমিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, মধ্য এশিয়া ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বাজার হতে পারে, তবে এটি চীনের মতো বড় তেল বাজারের ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না। তবুও রাশিয়ার বর্তমান জ্বালানি সংকট ইরানকে আঞ্চলিক জ্বালানি বাণিজ্যে নতুন অবস্থান তৈরির একটি সাময়িক সুযোগ এনে দিয়েছে।

