ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে তৈরি একটি ব্যঙ্গাত্মক ভাস্কর্য প্রদর্শন করা হয়েছে। সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ট্রাম্পকে তুলে ধরা এই আট ফুট উচ্চতার সোনালি ভাস্কর্যটি এরই মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ডেনমার্কের ভাস্কর জেন্স গালশিয়টের তৈরি এই শিল্পকর্মটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য অরেঞ্জ প্লেগ’। ২৩ ক্যারেট সোনার পাত দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যটিতে ট্রাম্পকে একটি ছোট আকৃতির মানুষের কাঁধে বসে থাকতে দেখা যায়। তার এক হাতে রয়েছে গলফ ক্লাব ও পৃথিবীর আকৃতির একটি বল, অন্য হাতে রয়েছে একটি দাঁড়িপাল্লা।
ভাস্কর্যের নিচের অংশে একটি ব্যঙ্গাত্মক বার্তাও লেখা রয়েছে, যেখানে ‘অন্যায়ের রাজা’র নামে একটি কথিত অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি অন্য একজনের ওপর বসে থাকলেও তার বোঝা কমানোর জন্য কিছু করবে না, শুধু তার পিঠ থেকে নামবে না।
শিল্পী জেন্স গালশিয়ট জানিয়েছেন, এই ভাস্কর্য মূলত বিশ্ব রাজনীতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জলবায়ু সংকট নিয়ে তার উদ্বেগের একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রকাশ। তার মতে, বর্তমান বিশ্বের নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সামনে কিছু রাজনৈতিক প্রবণতা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গালশিয়ট এর আগে রাজনৈতিক বার্তাবাহী আরও কয়েকটি আলোচিত ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। তার নতুন এই কাজটি তার আগের ‘সারভাইভাল অব দ্য ফ্যাটেস্ট’ নামের ভাস্কর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে বৈশ্বিক বৈষম্য বোঝাতে একজন ক্ষুধার্ত শিশুর কাঁধে একজন ভারী নারীর প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য পের ক্লসেন এই প্রদর্শনীর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি এমন একটি শিল্পকর্ম সহ্য করতে না পারেন, তাহলে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
ট্রাম্পকে নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন দেশে ব্যঙ্গাত্মক ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের একটি ৪৩ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্য যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে প্রদর্শন করা হয়েছিল। এর আগে ২০১৬ সালের নির্বাচনের সময়ও দেশটির বিভিন্ন স্থানে ট্রাম্পের আকৃতির কয়েকটি ব্যঙ্গাত্মক মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল।
তবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এই প্রদর্শনীকে সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে দেখছে না সবাই। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্লামেন্ট ভবনে সদস্যরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে প্রদর্শনী আয়োজন করতে পারেন। এসব প্রদর্শনী অনুমোদিত হলেও তা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমর্থন বোঝায় না।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রদর্শনী যদি আপত্তিকর, উসকানিমূলক বা প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হয়, তাহলে তা অনুমোদন না পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এই ভাস্কর্যের অনুমোদন পাওয়া নিয়ে শিল্পী এটিকে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
গালশিয়ট জানিয়েছেন, ট্রাম্পকে নগ্নভাবে উপস্থাপনের পেছনে ব্রিটিশ লেখক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের বিখ্যাত গল্প ‘সম্রাটের নতুন পোশাক’ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে। ওই গল্পে একজন অহংকারী সম্রাটের মিথ্যা গৌরব তুলে ধরার বিষয়টি ব্যঙ্গ করা হয়েছিল।
শিল্পীর ভাষায়, ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যঙ্গ করার মাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র ও ভাস্কর্য অনেক সময় সমাজে আলোচনার নতুন পথ তৈরি করে।
ভাস্কর্যটি বর্তমানে স্ট্রাসবুর্গে প্রদর্শিত হচ্ছে এবং আগামী নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এ এটি আবার প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে শিল্পী এর ছোট আকারের প্রতিরূপও বিতরণ করবেন বলে জানিয়েছেন।
ট্রাম্পকে ঘিরে তৈরি এই ভাস্কর্য আবারও দেখিয়েছে, আধুনিক রাজনীতিতে শিল্পকর্ম শুধু নান্দনিক প্রকাশ নয়; অনেক সময় তা রাজনৈতিক মতামত, সমালোচনা এবং সামাজিক বিতর্কের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

