মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায় অবশেষে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৩ সালের পর প্রথমবারের মতো বুধবার সুদের হার বাড়িয়েছে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত নীতিগত সুদের হার বা পুনঃক্রয় হার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। ছয় সদস্যের মুদ্রানীতি কমিটি সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের মুদ্রার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটছে, তখন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সেই ধারায় যুক্ত হলো।
এর আগে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও আরবিআই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থানে ছিল। বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ভারতের ওপর তেলের দামের প্রভাব কতটা পড়ে, তা বোঝার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছুটা সময় নিয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক সূচক এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে যাওয়ায় নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করেছে আরবিআই।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। দেশটির প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ বিদেশ থেকে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি দেশটির আমদানি ব্যয় ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে প্রভাব ফেলে।
এর পাশাপাশি দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। আগস্টে ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি টানা তৃতীয় মাস, যখন মূল্যস্ফীতি আরবিআইয়ের দীর্ঘমেয়াদি ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে অবস্থান করছে।
আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আগের বছরের মতো নিয়ন্ত্রণে নেই। তিনি জানান, খাদ্য ও পরিবহন খাতের বাইরে অন্যান্য খাতেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ ছড়িয়ে পড়ার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
মুদ্রানীতি কমিটি জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা নেই। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুযায়ী সুদের হার আরও বাড়ানো হতে পারে অথবা অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি সুদহার বৃদ্ধিই শেষ সিদ্ধান্ত নয়। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও মুদ্রাস্ফীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় আরবিআই আরও সুদহার বাড়াতে পারে।
এলারা ক্যাপিটালের বিশ্লেষক গরিমা কাপুর বলেন, বিশ্বজুড়ে সুদের হার বৃদ্ধির প্রবণতা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপ আরবিআইয়ের নীতিগত স্বাধীনতা কিছুটা সীমিত করেছে। তার মতে, চলমান চক্রে আরও ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট পর্যন্ত সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে রুপির দুর্বলতা। গত সপ্তাহে ভারতীয় মুদ্রা ডলারের বিপরীতে প্রায় রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। রুপির পতন ঠেকাতে আরবিআই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে প্রবাসী ভারতীয়দের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আকর্ষণের উদ্যোগও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপের ফলে সাময়িকভাবে রুপির পতন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও চাপ পুরোপুরি কাটেনি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট ভারতের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এবং সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক আমদানি করে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তেলের পাশাপাশি সার ও অন্যান্য আমদানি পণ্যের দাম বাড়লে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার বৃদ্ধি শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নয়, বরং দুর্বল মুদ্রা, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। তবে ভবিষ্যতে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আরবিআইয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

