ইরানে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে তেহরানকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ইরানের জন্য রাশিয়া নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে যা কিছু সম্ভব, তা করতে প্রস্তুত।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে এই আশ্বাস দিয়েছেন পুতিন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তানে কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস (সিআইএস) সম্মেলন উপলক্ষে দুই নেতার বৈঠকের পর এ বিষয়ে মন্তব্য করেন তিনি।
বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় পুতিন ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসানে ইরান ইতোমধ্যে প্রকৃত প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে বলে মস্কো মনে করে।
পুতিনের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনার মুখে পড়েছে।
বৈঠকে পুতিন ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কো ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দুই দেশই নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ককে অনেক বিশ্লেষক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।তবে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে দুই দেশই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইরানের বিরুদ্ধে মস্কোকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ করেছে ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলো। তাদের দাবি, ইরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন এবং স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্ষেত্রে ইরানকে তথ্য সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধেও রয়েছে। তবে মস্কো ও তেহরান বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
সিআইএস সম্মেলনে যোগ দিতে পুতিন ও পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার তুর্কমেনিস্তানে পৌঁছান। শুক্রবার দেশটির কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী পর্যটনকেন্দ্র আভাজায় সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে কিরগিজস্তানে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল।
সর্বশেষ বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এর আগে জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনা ‘অর্থহীন’ বলে মনে হচ্ছে।
পুতিনের বক্তব্যকে ইরানের প্রতি রাশিয়ার রাজনৈতিক সমর্থনের নতুন বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির বাস্তব পরিবর্তন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সিদ্ধান্ত, আলোচনার অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
একদিকে রাশিয়া ইরানকে সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে আগামী দিনে ইরান ইস্যুতে বড় শক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পুতিনের এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে রাশিয়ার অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে যুদ্ধ বন্ধে বাস্তব কোনো সমঝোতা তৈরি হয় কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান নজর।

