বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। আধুনিক যুদ্ধ সক্ষমতা, উন্নত প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজ দেশের ঘাঁটিতে নয়, বিভিন্ন মিত্র দেশের বিমানঘাঁটিতেও নিয়মিতভাবে সামরিক বিমান মোতায়েন করে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো দেশটির কৌশলগত বোমারু বিমানগুলো।
বোমারু বিমান এমন এক ধরনের সামরিক উড়োজাহাজ, যা আকাশ থেকে স্থল লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের হামলা চালাতে সক্ষম। এসব বিমান প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র বহনের সক্ষমতাও রাখে। তবে বিদেশের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান মোতায়েন সাধারণত স্থায়ী নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয় এবং পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে বোমারু বিমান মোতায়েনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে সতর্ক রাখা এবং মিত্র দেশগুলোকে নিরাপত্তার বার্তা দেওয়া। এটি এক ধরনের সামরিক কৌশল, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দেখাতে চায় যে কোনো সংকট তৈরি হলে তারা দ্রুত ওই অঞ্চলে শক্তি প্রয়োগ করতে সক্ষম।
কেন বিদেশে বোমারু বিমান রাখে যুক্তরাষ্ট্র?
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে বোমারু বিমান শুধু আক্রমণের অস্ত্র নয়, বরং একটি কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে এসব বিমান পাঠানোর অর্থ হলো, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে দ্রুত সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে।
যেমন, ইউরোপ, এশিয়া বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বোমারু বিমান মোতায়েনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের আশ্বস্ত করতে চায় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সতর্ক করে।
পরমাণু অস্ত্রের মতোই বোমারু বিমানও এক ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষ যেন কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সম্ভাব্য পাল্টা প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে।
ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি ও সাম্প্রতিক আলোচনার কারণ
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে মার্কিন বি-১বি ল্যান্সার বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
গত ৪ অক্টোবর সারাদিন ধরে ওই ঘাঁটি থেকে মার্কিন বোমারু বিমান উড্ডয়ন করতে দেখা যায়। পরে প্রায় এক ডজন বি-১বি ল্যান্সার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায়।
ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ভারী বোমারু বিমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র ছিল। ১৯৪৪ সালের ১৮ জানুয়ারি এই ঘাঁটির কার্যক্রম শুরু হয়। অতীতে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে এই ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সময়ও ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ইউরোপের এই ঘাঁটি থেকেই মার্কিন বিমানগুলো অভিযান পরিচালনা করেছিল বলে জানা যায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তাজনিত হুমকির কারণে বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এগুলো খুব বেশি দূরে সরানো হয়নি এবং প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহার করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোন কোন বোমারু বিমান রয়েছে?
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবহরে প্রধানত তিন ধরনের বোমারু বিমান রয়েছে। এগুলো হলো বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস, বি-১বি ল্যান্সার এবং বি-২ স্পিরিট। এছাড়া নতুন প্রজন্মের বি-২১ রেইডার ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বহরে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো বোমারু বিমানগুলোর একটি। বর্তমান বি-৫২এইচ মডেলটি ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে তৈরি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পরও এটি এখনো মার্কিন সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই বিমানটির ডানার বিস্তার প্রায় ৫৬ মিটার। এটি প্রায় ৩১ টন পর্যন্ত অস্ত্র বহন করতে পারে এবং প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনের সক্ষমতা রয়েছে।
বি-১বি ল্যান্সার তুলনামূলকভাবে দ্রুতগতির বোমারু বিমান। এটি শব্দের গতির চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ২ গুণ দ্রুত উড়তে পারে। এই বিমান প্রায় ৩৪ টন পর্যন্ত প্রচলিত অস্ত্র বহন করতে সক্ষম, যা যুক্তরাষ্ট্রের তিন ধরনের বোমারু বিমানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
তবে বর্তমানে বি-১বি ল্যান্সার পারমাণবিক অস্ত্র বহন করে না। যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে সরিয়ে নেওয়া বিমানগুলোও এই মডেলের ছিল।
বি-২ স্পিরিট হলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির স্টেলথ বোমারু বিমানগুলোর একটি। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শত্রুর শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যেতে পারে।
বি-২ বিমান পারমাণবিক ও প্রচলিত—দুই ধরনের অস্ত্র বহন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কেজি ওজনের শক্তিশালী বাঙ্কার ধ্বংসকারী বোমা, যা ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়।
এরপর আসছে বি-২১ রেইডার। এটি নতুন প্রজন্মের স্টেলথ বোমারু বিমান, যার পরীক্ষা চলছে। ২০২৭ সালে প্রথম বি-২১ এলসওয়ার্থ বিমানঘাঁটিতে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে বি-২১ এবং আধুনিকায়ন করা বি-৫২ দিয়ে বোমারু বিমান বহরের বড় অংশ পরিচালনা করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট কতটি বোমারু বিমান আছে?
মার্কিন বিমানবাহিনীর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বর্তমানে বি-১বি, বি-২ এবং বি-৫২এইচ মডেলের মোট ১৩৯টি বোমারু বিমান রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ৪৪টি বি-১বি ল্যান্সার, ১৯টি বি-২ স্পিরিট এবং ৭৬টি বি-৫২এইচ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস।
তবে এই সংখ্যা মোট বহরের হিসাব। সব বিমান সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় থাকে না এবং সবগুলো বিদেশি ঘাঁটিতে মোতায়েনও থাকে না।
কোন কোন দেশে মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়?
যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত স্থায়ীভাবে বিদেশে বোমারু বিমান রাখে না। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন মিত্র দেশের ঘাঁটিতে সাময়িকভাবে এসব বিমান পাঠানো হয়।
গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড, গুয়ামের অ্যান্ডারসেন বিমানঘাঁটি এবং ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি।
এছাড়া বম্বার টাস্ক ফোর্স কর্মসূচির আওতায় অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নরওয়ে, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশে অল্প সময়ের জন্য বোমারু বিমান পাঠানো হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলের টিন্ডাল ঘাঁটিতে বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। জাপান, নরওয়ে, স্পেন এবং অন্যান্য মিত্র দেশেও অতীতে মার্কিন বোমারু বিমান পাঠানো হয়েছে।
তবে বিদেশের মাটিতে বর্তমানে ঠিক কতগুলো মার্কিন বোমারু বিমান অবস্থান করছে, তার নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয় না।
বিশ্ব রাজনীতিতে বোমারু বিমানের গুরুত্ব
আধুনিক সামরিক কৌশলে বোমারু বিমান শুধু যুদ্ধের অস্ত্র নয়, এটি শক্তি প্রদর্শনের একটি মাধ্যম। কোনো অঞ্চলে এসব বিমান মোতায়েনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক অবস্থান এবং মিত্রদের প্রতি প্রতিশ্রুতির বার্তা দেয়।
তবে এসব মোতায়েন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনাও তৈরি করতে পারে। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো অনেক সময় এমন পদক্ষেপকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান বহর শুধু একটি সামরিক সম্পদ নয়; এটি দেশটির বৈশ্বিক প্রভাব, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

