মানচিত্র ও পথনির্দেশনা দেওয়ার জনপ্রিয় অ্যাপ ওয়েজ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরাক। ইসরায়েলে তৈরি এই অ্যাপকে ঘিরে দেশটিতে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি উৎসের কারণে অ্যাপটি বন্ধ করা হবে। তবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষা এবং নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতার বিষয়ও সামনে এসেছে।
ইরাকের যোগাযোগমন্ত্রী মুস্তাফা সানাদ জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের শুরুতে দেশটিতে ওয়েজ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে। উত্তর ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী এরবিলে অনুষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রদর্শনী হিটেক্স ২০২৬-এ তিনি এই ঘোষণা দেন।
মন্ত্রী বলেন, অ্যাপটি ইসরায়েলে তৈরি হওয়ায় এটি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি ওয়েজের তথ্য ব্যবস্থাপনা বা নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়কে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেননি।
ওয়েজ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় নেভিগেশন অ্যাপ। এটি শুধু রাস্তার দিকনির্দেশনা দেয় না, বরং ব্যবহারকারীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যানজট, দুর্ঘটনা, রাস্তা বন্ধ থাকা কিংবা নিরাপত্তা চেকপোস্টের তথ্যও সরবরাহ করে। ফলে অনেক চালক, বিশেষ করে ট্যাক্সি চালকেরা দ্রুত পথ খুঁজে নিতে এই অ্যাপ ব্যবহার করেন।
অ্যাপটি মূলত ইসরায়েলে তৈরি হয়েছিল। পরে ২০১৩ সালে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বিনিময়ে ওয়েজ কিনে নেয়। বর্তমানে এটি গুগলের মালিকানাধীন হলেও ইরাকের সিদ্ধান্তে মূলত এর ইসরায়েলি উৎপত্তিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
ইরাকের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। দেশটি ১৯৪৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ২০২২ সালে ইরাক এমন একটি আইন পাস করে, যেখানে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়।
এই আইনের আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ওয়েজ নিষিদ্ধের ক্ষেত্রে সরকার এখনো স্পষ্টভাবে জানায়নি যে এই সিদ্ধান্ত ওই আইনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে কি না।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়েজ নিষিদ্ধের পেছনে শুধু রাজনৈতিক কারণ নয়, তথ্য নিরাপত্তার বিষয়ও আলোচনায় আসছে। কারণ আধুনিক নেভিগেশন অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীর অবস্থান, যাতায়াতের পথ, গন্তব্য, অনুসন্ধানের ইতিহাস এবং ডিভাইস সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
একজন ব্যবহারকারীর তথ্য হয়তো আলাদা করে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু লাখো মানুষের দীর্ঘ সময়ের অবস্থান ও চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করলে কোনো দেশের সামাজিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এ কারণেই অনেক দেশ বিদেশি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সতর্ক থাকে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, শুধু ওয়েজ নিষিদ্ধ করলেই কি তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? কারণ একই ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এমন আরও অনেক আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সেবা ইরাকে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো একটি অ্যাপ বন্ধ করার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব তথ্য নীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ইরাক সরকার ওয়েজের বিকল্প হিসেবে গুগল ম্যাপস এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি নেভিগেশন অ্যাপ ব্যবহারের কথা বলেছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি ইরাকি অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে, যা ভবিষ্যতে ওয়েজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি স্থানীয় মানচিত্র তৈরি করলেই আন্তর্জাতিক মানের নেভিগেশন সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নির্ভুল ভৌগোলিক তথ্য, নিয়মিত হালনাগাদ রাস্তার তথ্য, যানজট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে পাওয়া তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তি।
ইরাকি প্রযুক্তি গবেষক মুস্তাফা কামেল আল-শরিফের মতে, একটি জাতীয় নেভিগেশন ব্যবস্থা তৈরি করতে শুধু একটি অ্যাপ বা স্থানীয় মানচিত্র যথেষ্ট নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অবকাঠামো এবং শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
ওয়েজ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্পর্কিত সংঘাতের কারণে ইরাকে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে সিদ্ধান্তটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। সরকার এখনো জানায়নি কীভাবে ওয়েজ বন্ধ করা হবে, এটি শুধু ইরাকের মূল ভূখণ্ডে কার্যকর হবে নাকি কুর্দিস্তান অঞ্চলও এর আওতায় থাকবে। স্থানীয় বিকল্প অ্যাপ কবে চালু হবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, গুগল ম্যাপস যদি ব্যবহার করা যায়, তাহলে একই প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ওয়েজ কেন নিষিদ্ধ হচ্ছে। কারণ দুটি সেবাই ব্যবহারকারীর অবস্থান ও চলাচলের তথ্য নিয়ে কাজ করে। ফলে প্রযুক্তিগত যুক্তি এবং রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ইরাকের ওয়েজ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত শুধু একটি অ্যাপ বন্ধ করার ঘটনা নয়। এটি প্রযুক্তি, তথ্য নিরাপত্তা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংযোগস্থলে তৈরি হওয়া একটি উদাহরণ। ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশ বিদেশি প্রযুক্তি সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান নেবে কি না, এই সিদ্ধান্ত সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

