শান্তিতে নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আবারও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার সাবেক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক নাভি পিল্লাইকে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি ‘লজ্জাজনক’ ও ‘হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সিরাকিউজে এক রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, তিনি নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাইয়ের নাম আগে কখনো শোনেননি। পুরস্কার ঘোষণার পর তিনি নরওয়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এই সিদ্ধান্ত দেশটির জন্য একটি “মুছে ফেলা কঠিন দাগ” হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “আমরা এটি ভুলব না।”
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন। এর আগে ২০২৫ সালেও তিনি পুরস্কার না পাওয়ার পর অসন্তোষ জানিয়েছিলেন, যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে।
তবে নোবেল শান্তি পুরস্কারের সিদ্ধান্ত নরওয়ে সরকার নেয় না। এটি একটি স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। গত বছর নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরে ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন, নোবেল পুরস্কার প্রদানকারী কমিটি সরকারের অধীন নয় এবং তারা স্বাধীনভাবে বিজয়ী নির্বাচন করে।
সমাবেশে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি আটটি যুদ্ধের সমাধান করেছেন এবং আরও দুটি সংঘাত সমাধানের পথে রয়েছেন। তবে এসব দাবির পক্ষে তিনি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তিনি আরও বলেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার “কয়েকজন উগ্র মতাদর্শীর কারণে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে”।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর আবারও নোবেল শান্তি পুরস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও নোবেল কমিটি বরাবরই বলে আসছে, পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে মানবাধিকার, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অবদানের বিষয়গুলো বিবেচনা করে।
২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।
নরওয়ের নোবেল কমিটি জানিয়েছে, যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক প্রধান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক বিচারক ছিলেন। মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর কয়েক দশকের কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে।
পুরস্কারের খবর পাওয়ার সময় ৮৫ বছর বয়সী পিল্লাই জার্মানির নুরেমবার্গের বিচার ভবনে ছিলেন। প্রথমে তিনি বিষয়টিকে রসিকতা মনে করেছিলেন বলে জানান। পরে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এই স্বীকৃতি তাঁর একার নয়, বরং মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করা অসংখ্য মানুষের।
হাস্যরস করে পিল্লাই আরও বলেন, সবাই যদি আরও বেশি হাততালি দেন, তাহলে হয়তো তিনি এই পুরস্কার ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালে পুরস্কার না পাওয়ার পর তাঁর প্রশাসন অভিযোগ করেছিল, নোবেল কমিটি শান্তির চেয়ে রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে নিজের নোবেল পদক ট্রাম্পকে উপহার দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নিজের দেশের স্বাধীনতার জন্য ট্রাম্পের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে এই পদক উৎসর্গ করছেন। ট্রাম্প তখন এটিকে পারস্পরিক সম্মানের একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
তবে নোবেল কমিটি পরে পরিষ্কার করে জানায়, একবার কোনো ব্যক্তির নামে পুরস্কার ঘোষণা হয়ে গেলে তা অন্য কাউকে দেওয়া, ভাগ করা বা স্থানান্তর করা যায় না। কমিটির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং স্থায়ী।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার অন্যতম বিষয়। বিভিন্ন সময়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে কমিটির দাবি, তারা শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাস্তব অবদানের ভিত্তিতেই বিজয়ী নির্বাচন করে।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কও শুধু একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নিয়ে নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে শান্তি, ক্ষমতা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে ট্রাম্প নিজের অবদানের স্বীকৃতি না পাওয়ার অভিযোগ তুলছেন, অন্যদিকে নাভি পিল্লাইয়ের পুরস্কার আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের গুরুত্বকে সামনে আনছে।

