দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারে ভূষিত করেছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।
শুক্রবার পুরস্কার ঘোষণা করে নোবেল কমিটি জানায়, নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং সহিংসতার শিকার মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। তার কাজের মধ্যে ছিল বিচারিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিগত সততা এবং অসাধারণ সাহসের প্রকাশ।
৮৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া পঞ্চম দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিক। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন—তার পুরো জীবনই মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত।
নাভি পিল্লাইয়ের জন্ম ১৯৪০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশের ডারবানে। সে সময় দেশটি কঠোর বর্ণবৈষম্য নীতির অধীনে পরিচালিত হতো। তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নেওয়া পিল্লাই ছোটবেলা থেকেই বৈষম্যের বাস্তবতা দেখেছেন।
তিনি নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি নাটাল প্রদেশের প্রথম নারী হিসেবে নিজস্ব আইন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের বহু কর্মীর পক্ষে আইনি লড়াই করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের সময় মানবাধিকার রক্ষায় তার ভূমিকা তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। তিনি রাজনৈতিক বন্দীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করেন এবং ১৯৭৩ সালে এমন একটি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যার মাধ্যমে রবেন দ্বীপে বন্দীদের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আরও শক্তিশালী হয়। এই দ্বীপেই দীর্ঘ সময় বন্দি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা।
পিল্লাই পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চ আদালতের বিচারক হন। তিনি ছিলেন দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক। এরপর তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করা হয়।
রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে যৌন সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তার কাজ উল্লেখযোগ্য ছিল।
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করেন।
পরবর্তীতে তিনি জাতিসংঘের দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন। ওই কমিশন ২০২৫ সালে গাজায় সংঘটিত ঘটনাবলি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
বর্তমানে নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলার সঙ্গেও তিনি যুক্ত রয়েছেন।
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তখন নাভি পিল্লাইকে এই পুরস্কার দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কমিটির মতে, শান্তি শুধু রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে আসে না; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো সাহসী মানুষ।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক নাভি পিল্লাইয়ের পুরস্কারকে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতার প্রতি বিশ্ববাসীর পুনরায় আস্থার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা তার এই অর্জনকে সাহস, সততা এবং আজীবন ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের স্বীকৃতি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
শান্তি ও সংঘাত গবেষণার বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, নাভি পিল্লাইয়ের নির্বাচন আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বকে সামনে এনেছে। তাদের মতে, এমন এক সময়ে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে যখন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ, মানবাধিকার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত গবেষণার অধ্যাপক অশোক স্বাইন বলেন, নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘদিনের গণহত্যা ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস তাকে এই পুরস্কারের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে।
নোবেল পাওয়ার খবর প্রথমে শুনে নাভি পিল্লাই নিজেও বিস্মিত হয়েছিলেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি মজা করে বলেন, খবরটি সত্য কি না সেটিই আগে নিশ্চিত হতে চান। পরে তিনি জানান, এই পুরস্কার তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার সব মানুষের প্রতি উৎসর্গ করবেন।
তিনি বলেন, এই স্বীকৃতি তাকে আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করায় যে আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং নীতিনির্ভর আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক তরুণ আইনজীবী থেকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠা নাভি পিল্লাইয়ের পথচলা প্রমাণ করে, দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচারের সংগ্রাম একসময় বিশ্ব স্বীকৃতি পেতে পারে। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার তাই শুধু একজন বিচারকের অর্জন নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তাও।

