ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধী দলগুলো এবং বিভিন্ন আন্দোলনকারী গোষ্ঠী।
অভিযোগ উঠেছে, বিপুলসংখ্যক ভোটারের তালিকা যাচাইয়ের সময় কারসাজি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জ্ঞানেশ কুমার।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর তাকে ঘিরে সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা, নিবন্ধন পদ্ধতি এবং নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে তার দুই ডেপুটি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্কের মধ্যে শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেয় সিজেপি। একই সঙ্গে সিইসির পদত্যাগের দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলন চলছে।
এর মধ্যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতভর অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভকারী হিসেবে সন্দেহভাজন ৪০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই জ্ঞানেশ কুমার কে? কীভাবে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হলেন তিনি?
প্রশাসন থেকে নির্বাচন কমিশনে
৬২ বছর বয়সী জ্ঞানেশ কুমার ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি সরকারি কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৮ সালে তিনি ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় (আইএএস) যোগ দেন।
কর্মজীবনের পরবর্তী সময়ে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০১৬ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জম্মু ও কাশ্মীরবিষয়ক বিভাগে যোগ দেন জ্ঞানেশ কুমার। ওই সময় জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিলের খসড়া প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
২০১৯ সালে এই আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে অঞ্চলটির বিশেষ আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করা হয়।
অযোধ্যার রাম মন্দির প্রকল্পেও দায়িত্ব
২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের পথ খুলে দেয়। এরপর আদালতের রায় বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা একটি দলের প্রধান করা হয় জ্ঞানেশ কুমারকে।
মন্দির নির্মাণের কাজ তদারকির জন্য একটি ট্রাস্ট গঠন করাও ওই দলের দায়িত্বের মধ্যে ছিল।
চলতি বছর ওই ট্রাস্টের বিরুদ্ধে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া কয়েক মিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। তবে কোনো অভিযোগ ওঠা এবং তা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
অবসরের পর দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সরকারি প্রশাসনিক চাকরি থেকে অবসর নেন জ্ঞানেশ কুমার। এর দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ভারতের সাধারণ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার ঠিক এক দিন আগে তাকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পান তিনি। ২০২৩ সালে প্রণীত নতুন আইনের অধীনে নিয়োগ পাওয়া প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনারও তিনি।
ওই আইনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটি থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এর ফলে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।
জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগের বিরোধিতা করেছিলেন বাছাই কমিটির তৃতীয় সদস্য এবং বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। ২০২৩ সালের আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টেও মামলা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে দুই বিচারপতির একটি বেঞ্চ এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন এবং প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর বেঞ্চে বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে নতুন সংকট
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বর্তমান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কারসাজি করা হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তার পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে কমিশনের অভ্যন্তরে দুই ডেপুটির একাধিক আনুষ্ঠানিক আপত্তির বিষয় উঠে আসায় বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ দায়িত্বে পৌঁছানো জ্ঞানেশ কুমার এখন রাজনৈতিক চাপ ও সমালোচনার মুখে রয়েছেন।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগ, তার নিয়োগপ্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্ক এবং বিক্ষোভকারীদের পদত্যাগের দাবি—সবকিছু মিলিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রামাণ্য তথ্যের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

