জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি, তীব্র এল নিনোর আশঙ্কা এবং ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়া, একসঙ্গে এই তিন সংকটের মুখে পড়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। এতে এসব দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং নতুন করে দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকি। পরিস্থিতি সামাল দিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে সাশ্রয়ী অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। গার্ডিয়ানের বরাতে এ খবর জানা গেছে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রশাসক আলেক্সান্ডার ডি ক্রু এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠক শুরুর আগে তিনি এ আহ্বান জানান। এর আগে সংস্থাটি ‘নো টাইম টু রিকভার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যাতে জ্বালানি, জলবায়ু ও ঋণসংকটের সম্মিলিত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। ডি ক্রুর ভাষ্য, উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন চারদিক থেকে চাপে আছে এবং পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে উঠছে। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে সংকটগুলো একে অপরের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে কয়েক কোটি থেকে শত কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগের কারণ জ্বালানি তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। এর সরাসরি ধাক্কা লাগছে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলোতে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পণ্য উৎপাদনের খরচ বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত সেই চাপ পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
ইউএনডিপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। তখন সরকারগুলোর জরুরি নানা পদক্ষেপে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ১৩ কোটি মানুষ বাড়তি খরচের চাপ থেকে রক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু সেই সুরক্ষা এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে। কারণ, অনেক দেশের সরকারের হাতে সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ফলে বাড়তি দামের বোঝা সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ডি ক্রুর মতে, আগে যে বাড়তি ব্যয় সরকার নিজে বহন করত, এখন তা জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ সরকারের আর্থিক সক্ষমতা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালানো আরও কঠিন হবে। গত কয়েক বছরে দারিদ্র্য কমানোর যে অগ্রগতি হয়েছে, তাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জ্বালানির পাশাপাশি জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ইউএনডিপির আশঙ্কা, এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। প্রতিবেদনে দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র এল নিনোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এতে বিভিন্ন অঞ্চলে ফসলহানির পাশাপাশি চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাবে কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরা, আবার কোথাও ভারী বৃষ্টিপাত দেখা দিতে পারে। কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্যের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হবে। কৃষিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ সেখানে অনেক মানুষের জীবিকা কৃষির সঙ্গে জড়িত। ফসলহানি হলে একদিকে কৃষকের আয় কমে, অন্যদিকে খাদ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যায়।
তৃতীয় বড় সমস্যা ঋণের খরচ বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বন্ডবাজারে বিক্রির চাপ বাড়ায় বিভিন্ন দেশের সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ছে। ইউএনডিপির হিসাবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বন্ডের মাধ্যমে অর্থ তোলার খরচ এখন প্রায় ৯ শতাংশ, যা ডি ক্রুর মতে অত্যন্ত বেশি। সুদ বাড়লে সরকারের বাজেটের বড় অংশ সুদ ও আসল পরিশোধে চলে যায়। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয়ের সুযোগ কমে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান তৈরি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
ডি ক্রু আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এখন থেকে আগামী বসন্ত পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, জ্বালানির দাম, এল নিনো ও আন্তর্জাতিক বন্ডবাজার, এই তিন ক্ষেত্রের কোনোটিতেই আপাতত সংকট কাটার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ঋণ মওকুফের উদ্যোগকে সমর্থন করলেও ইউএনডিপি বলছে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে অনেক সময় লাগতে পারে। অথচ ঋণ, জ্বালানি ও জলবায়ু সংকটের ধাক্কা এখনই সামলাতে হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। তাই দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা জরুরি। এ কারণে ডি ক্রু আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা, বহুপক্ষীয় ব্যাংক ও দাতা দেশগুলোকে কম সুদে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র পরিবারগুলোকে বাঁচাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা দরকার।
সম্প্রতি আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা উন্নত দেশগুলোকে সরকারি খরচ কমানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন, যাতে বিশ্ববাজারে বন্ডের সুদহার কিছুটা কমে। ডি ক্রু এই আহ্বানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তাঁর মতে, শুধু উন্নত দেশগুলোর খরচ কমালেই সংকটের সমাধান হবে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর ও কৃষিপ্রধান দেশের জন্য এই সতর্কবার্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তেলের দাম, খাদ্যের দাম ও বিদেশি ঋণের খরচ একসঙ্গে বাড়লে আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়ে। ব্যাংককের বৈঠকে এই ত্রিমুখী সংকটের মোকাবিলায় কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

