ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল দ্রুত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার বদলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থায়। তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় অনেক দেশ নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে।
আর এখানেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন, তার আমলেই বিশ্বজুড়ে পরিচ্ছন্ন শক্তির দিকে আগ্রহ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, এটি এক ধরনের ঐতিহাসিক বৈপরীত্য। ট্রাম্প যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর নীতি নিয়েছেন, সেখানে ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট বিশ্বের অনেক দেশকে তেল ও গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু উদ্যোগের পরিচালক সামান্থা গ্রস বলেন, ট্রাম্পের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতি হয়তো উল্টো ফল তৈরি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট বিশ্বকে তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমানোর দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তেল সংকট বদলে দিচ্ছে বৈশ্বিক হিসাব
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে, যা বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
এই পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। শুরুতে অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক হবে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় জ্বালানি বাজারের চাপও স্থায়ী রূপ নিতে শুরু করে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত হুতিদের সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও জাহাজে হামলার মতো নতুন ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদায়। ২০২৬ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ধারণা করেছিল, বিশ্বে প্রতিদিন তেলের চাহিদা প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল বাড়বে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অচলাবস্থার কারণে এখন সংস্থাটি ২০২৬ সালে প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল তেলের চাহিদা কমার পূর্বাভাস দিয়েছে।
কমছে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, কমতে পারে কার্বন নিঃসরণ
তেলের ব্যবহার কমার অর্থ হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী কার্বন নিঃসরণও কমতে পারে। জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্বন ব্রিফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নিঃসরণ প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমার পথে রয়েছে।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যাওয়ার পর এটিই হতে পারে প্রথমবারের মতো নিঃসরণ কমার ঘটনা।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত সাময়িকভাবে কমলেও সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে নতুন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি ৪ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বৈদ্যুতিক গাড়ির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে, কারণ এগুলো জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উচ্চ জ্বালানি খরচের সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার
অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ইউরোপে ২০২৬ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে পরিবহন ও পরিবেশ বিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বছরের শুরু থেকে ডিজেলের দাম প্রায় ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক গ্রাহক বিকল্প জ্বালানির দিকে আগ্রহী হচ্ছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে চিত্রটি ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য সরকারি সহায়তা কমেছে এবং সস্তা চীনা মডেলের গাড়ি বাজারে প্রবেশে বাধা তৈরি হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান মোটর ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে।
গ্যাস সংকটও বাড়াচ্ছে বিকল্প শক্তির চাহিদা
ইরান যুদ্ধ শুধু তেলের বাজার নয়, প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে, এই সংঘাত বিশ্ব গ্যাস বাজারে বড় সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে এবং ২০২৬ সালে গ্যাসের বৈশ্বিক চাহিদা প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে।
এ কারণে অনেক দেশ সৌর ও বায়ুশক্তির দিকে দ্রুত ঝুঁকছে। কারণ এসব উৎস তেল ও গ্যাসের মতো নির্দিষ্ট কোনো ভূরাজনৈতিক পথের ওপর নির্ভরশীল নয়।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল এনার্জি, ক্লাইমেট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ল্যাবের পরিচালক অ্যামি মায়ার্স জাফে বলেন, নতুন জ্বালানি ভূরাজনীতি বিশ্বকে পরিচ্ছন্ন শক্তি ও বিদ্যুতায়নের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ চলতি বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকে প্রায় চার গুণ বেড়েছে। কারণ ওই অঞ্চলের অনেক দেশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে এবং যুদ্ধের কারণে তারা বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।
তবে কয়লার ব্যবহারও বাড়ছে
পরিচ্ছন্ন শক্তির দিকে ঝোঁক বাড়লেও পরিস্থিতি পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। অনেক দেশ দ্রুত বিকল্প জ্বালানি নিশ্চিত করতে কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে, যা পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানিগুলোর একটি।
আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী কয়লার চাহিদা প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে। এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, কয়লার ব্যবহার কিছুটা কমবে।
এছাড়া তেল ও গ্যাসের চাহিদা আবারও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ২০২৭ সালে তেলের চাহিদা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।
এর আগে করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও অনেক পরিবেশবিদ আশা করেছিলেন, বিশ্ব অর্থনীতি নতুনভাবে সাজানোর ফলে পরিচ্ছন্ন শক্তির ব্যবহার বাড়বে। কিন্তু ২০২১ সালে জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা আবার বেড়ে যায়।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তত বাড়বে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপর নির্ভর করছে জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের মাত্রা।
নরওয়ের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিএনভির বিশ্লেষণ বলছে, সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, তেলের চাহিদা স্থায়ীভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। প্রতিষ্ঠানটির একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, যুদ্ধ যদি চার বছর স্থায়ী হয়, তাহলে ২০২৫ সালের পর্যায়ে তেলের চাহিদা আর ফিরে নাও আসতে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সামান্থা গ্রসের মতে, ইরান সংকট বিশ্বকে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝিয়েছে—তেল ও গ্যাস সরবরাহ আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিরাপদ।
তবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী রব জ্যাকসন ট্রাম্পকে ‘অনিচ্ছাকৃত জলবায়ু প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দেখার ধারণাকে অযৌক্তিক বলে মনে করেন। তার মতে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে পরিচ্ছন্ন শক্তির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছেন, যদিও বিশ্বের অন্যান্য দেশে জ্বালানি নিরাপত্তার কারণে সবুজ শক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরিচ্ছন্ন শক্তির দিকে বৈশ্বিক পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি হবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সস্তা, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রয়োজনই ভবিষ্যতে বিশ্বের জ্বালানি নীতির দিক নির্ধারণ করবে।

