ভারতের ঐতিহাসিক ও অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ‘টাটা গ্রুপ’-এর হোল্ডিং কোম্পানি ‘টাটা সানস’ এবং এর সিংহভাগ শেয়ারের মালিক জনকল্যাণমূলক সংস্থা ‘টাটা ট্রাস্ট’-এর মধ্যে নজিরবিহীন নীতিগত সংঘাত শুরু হয়েছে। টাটা সানসকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা বা আইপিও আনা এবং বর্তমান চেয়ারম্যান এন. চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ বৃদ্ধির পুনর্নিয়োগ প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে দুই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব এখন প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে টাটা গ্রুপের কিংবদন্তি চেয়ারম্যান রতন টাটার প্রয়াণের পর তাঁর সৎ ভাই নোয়েল টাটা ‘টাটা ট্রাস্ট’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শুরু হওয়া এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন ভারতের পুরো কর্পোরেট মহলকে তোলপাড় করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং বিবিসি-র তথ্যের সূত্র ধরে ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এ প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা গেছে, টাটা সানসের পর্ষদ সভার অধিকাংশ পরিচালক এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডার ‘শাপুরজি পালোনজি (এসপি) গ্রুপ’ হোল্ডিং কোম্পানিটিকে শেয়ারবাজারে উন্মুক্ত করতে বা আইপিও আনতে এবং এন. চন্দ্রশেখরনকে পুনরায় চেয়ারম্যান করার পক্ষে প্রস্তাব পাস করেছিল। তবে টাটা ট্রাস্টের প্রধান নোয়েল টাটা এই দুটি সিদ্ধান্তেরই কড়া বিরোধিতা করেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, টাটা সানসকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করলে টাটা গ্রুপের দেড় শতাধিক বছরের পুরোনো জনকল্যাণমুখী ও চ্যারিটেবল নীতি সংকুচিত হয়ে পড়বে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাণিজ্যিক মুনাফার চাপ ট্রাস্টের মূল লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে। আসন্ন বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) এই দুটি প্রস্তাব বাতিলের জন্য ভোটাভুটির প্রস্তুতি নিচ্ছেন নোয়েল টাটা।
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)-এর ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী টাটা সানসকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এড়াতে বেশ কিছু বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেছেন নোয়েল টাটা। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন যে, শেয়ারবাজারে না গিয়ে টাটা সানস নিজেরাই এসপি গ্রুপের কাছে থাকা সংখ্যালঘু শেয়ারের একটা অংশ বাইব্যাক বা পুনঃক্রয় করে নিতে পারে। এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চমাত্রার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্যাটাগরি বা ক্লাসিফিকেশন পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে টাটা সানসের অধীনে থাকা দুটি বড় ব্যবসাকে মূল হোল্ডিং কোম্পানির সাথে একীভূত করার পুনর্গঠন প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এছাড়া টাটা ট্রাস্টের ভাইস-চেয়ারম্যান ভেনু শ্রীনিবাসন ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ পরিচালনায় কিছু প্রশাসনিক অনিয়মের তদন্ত দাবি করায় ট্রাস্ট ও হোল্ডিং কোম্পানির মধ্যকার এই বিরোধ আর কেবল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই।
২০২৪ সালে রতন টাটার বিদায়ের পর থেকেই টাটা গ্রুপের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে যে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। রতন টাটা জীবদ্দশায় কোনো পাবলিক ট্রানজিশন না করে তাঁর মৃত্যুর পর নোয়েল টাটাকে ট্রাস্টের উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করে যান। কর্পোরেট সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, রতন টাটার যে একক সর্বজনগ্রাহ্য কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ টাটা সানস এবং টাটা ট্রাস্ট; উভয় প্রতিষ্ঠানের ওপর ছিল, নোয়েল টাটার ক্ষেত্রে সেই একক সর্বময় ক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে টাটা সানসের পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীন কর্পোরেট দৃষ্টিভঙ্গি এবং টাটা ট্রাস্টের ঐতিহাসিক জনকল্যাণমূলক দর্শনের মধ্যে এক ধরনের কাঠামোগত অসামঞ্জস্য ফুটে উঠেছে।
১৮৬৮ সালে জমশেদজি টাটা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই ভারতীয় বহুজাতিক গ্রুপটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বজুড়ে ১০০টিরও বেশি দেশে বিস্তার লাভ করা এ শিল্পগোষ্ঠী লবণ, চা ও স্টিল উৎপাদন থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি (টিসিএস) এবং বিমান চলাচলের মতো সংবেদনশীল খাতের শীর্ষ ড্রাইভার। ২০১৬ সালে সাবেক চেয়ারম্যান সাইরাস মিস্ত্রিকে বরখাস্ত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই গড়ালেও, এবারের বিতর্কটি ভিন্ন মাত্রার। কারণ এবার সরাসরি টাটা গ্রুপের মূল ব্যবসায়িক হোল্ডিং কোম্পানির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে তাঁদের চালিকাশক্তি ট্রাস্ট। প্রাতিষ্ঠানিক এই দ্বন্দ্বে টাটার কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহক, বিশ্বস্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও, সবাই তাকিয়ে আছেন আসন্ন এজিএম-এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।

