দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যেই উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে শত শত পোস্টার ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পোস্টারগুলোতে সাধারণ মানুষকে বিরিয়ানি খাওয়া ও পূজার কেনাকাটা শুধু হিন্দু ব্যবসায়ীদের দোকান থেকে করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পোস্টারগুলো লাগিয়েছে ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’ নামের একটি সংগঠন। বিরোধী দলগুলো এর তীব্র সমালোচনা করে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে নিশানা করেছে। উৎসবের মৌসুমে বাঙালির আমিষ খাবার নিয়ে পুরোনো বিতর্কও এতে নতুন করে উসকে উঠেছে।
শহরের বিভিন্ন স্থানে টানানো পোস্টারে একাধিক বার্তা রয়েছে। এর মধ্যে আছে ‘বিরিয়ানি খেতে বারণ করা হচ্ছে না, বিরিয়ানি খান, কিন্তু হিন্দু দোকান থেকে’, ‘মাংস কিনতে হলে হিন্দু দোকান থেকে কিনুন’ এবং ‘কিউআর কোডে টাকা পরিশোধের আগে বিক্রেতার নাম শুনে নিন’। অন্য বার্তাগুলোতে সব জাতের হিন্দুকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং মাদক বা আসক্তিমুক্ত সমাজ গড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনের নেতারা বলছেন, তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নন। তাঁদের দাবি, প্রধান এই উৎসবের মৌসুমে হিন্দু ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া উচিত। শিলিগুড়ি থেকে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে সংগঠনটির নেতা প্রশান্ত সরকার বলেন, ঐতিহ্য অনুযায়ী পূজার সময় তাঁরা আমিষ খাবার খাবেন। তবে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের আবেদন, হিন্দু দোকান থেকে বিরিয়ানি খেতে হবে এবং ফুলসহ পূজার উপকরণও হিন্দু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনতে হবে।
দক্ষিণবঙ্গের সোনারপুরের হিন্দু জাগরণ মঞ্চের আরেক নেতা নিলঞ্জন পান্ডা বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে বিশাল এক অর্থনীতি গড়ে ওঠে। সেখানে হিন্দুরা কেন লাভবান হবেন না, এই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, সংগঠনটি দক্ষিণবঙ্গের কিছু পূজা কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং মণ্ডপের আশপাশে শুধু হিন্দু দোকানদার ও স্টল মালিকদের বসার অনুমতি দিতে অনুরোধ জানিয়েছে।
হিন্দু জাগরণ মঞ্চ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সঙ্গে যুক্ত একটি জাতীয়তাবাদী হিন্দু সংগঠন। আরএসএসকে বিজেপির আদর্শগত অভিভাবক সংগঠন হিসেবে গণ্য করা হয়। সংগঠনটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৮ সালের দিকে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সেলিম একে সুপরিকল্পিত বিচ্ছিন্নকরণের অংশ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এর লক্ষ্য একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে ঠেলে সরানো, সামাজিক বিভাজন তৈরি করা এবং অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করা। তিনি অতীতের কিছু ঘটনার কথাও তোলেন। তাঁর দাবি, জয়পুর পৌরসভায় এক সময় গরুর গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যার চালকদের বেশির ভাগই মুসলিম। আবার তিনি শুনেছেন, মুর্শিদাবাদের লালবাগে ঘোড়ার গাড়ি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বিজেপি। শেষোক্ত দাবিটি তিনি শোনা কথা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে কৃষাণু মিত্র বলেন, কোনো ধর্মনিরপেক্ষ দেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া যায় না। তিনি এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুলিশের অবিলম্বে আইনি পদক্ষেপ দাবি করেন। কটাক্ষ করে তিনি আরও বলেন, সংগঠনগুলো হিন্দুদের নিয়ে এতই চিন্তিত হলে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে কথা বলে হিন্দুদের জন্য পেট্রলের দাম কমাক। পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লি, দুই জায়গায় এখন বিজেপির ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার। তাঁর ভাষায়, এসব কর্মকাণ্ড হাস্যকর এবং সমাজের জন্য বিপজ্জনক।
বিজেপির শিলিগুড়ি জেলা সভাপতি অরুণ মণ্ডল সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি বলেন, যে কেউ যেকোনো বিষয়ে আহ্বান জানাতে পারেন। যাঁরা পোস্টার লাগিয়েছেন, তাঁরাই এর উত্তর দিতে পারবেন। তিনি নিজে পোস্টারগুলো দেখেননি বলেও জানান।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম দুর্গাপূজা। এবার উৎসবের দিনগুলোতে মানুষের খাবারের পছন্দ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে। আগস্টে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) দুর্গাপূজার জন্য কিছু দিকনির্দেশনা জারি করেছিল। এর একটি শর্ত ছিল, মণ্ডপের ভেতরে আমিষ খাবার নেওয়া যাবে না এবং বাইরে তা বিক্রিও করা যাবে না। তীব্র বিতর্কের পর সংগঠনটি স্পষ্টীকরণ দিয়ে জানায়, আমিষ খাবারে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি এবং তারা কোনো ফতোয়া জারি করে না।
এই বিতর্ক থিতু হওয়ার আগেই মধ্যপ্রদেশের বাঘেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী নতুন মন্তব্য করেন। তিনি ‘বাঘেশ্বর বাবা’ নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় তিনি মানুষকে দুর্গাপূজায় আমিষ খাওয়া ও মদপান থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেন। সফরে তাঁকে ক্ষমতাসীন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
এ মন্তব্যে বিরোধী দলগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে আসেন। তিনি বলেন, শাস্ত্রীর বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত মত হিসেবেই দেখা উচিত। শমীকের প্রশ্ন ছিল, বাড়িতে কী খাওয়া হবে, তা কোনো সাধু বা রাজনৈতিক দল ঠিক করে দেবে কেন। তাঁর ভাষ্য, বাঙালি যা খেয়ে অভ্যস্ত, তা-ই খাবে। মাছ-মাংস খাওয়া বাঙালির স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস। তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সম্মতির কথাও উল্লেখ করেন। শমীক বলেন, মা কালী নিজেই পাঁঠার মাংস গ্রহণ করেন।
পোস্টারের ভাষা সরাসরি আমিষ খাবারে নিষেধাজ্ঞা নয়। এখানে বলা হচ্ছে, খাওয়া যাবে, তবে কেনা হবে নির্দিষ্ট ধর্মের বিক্রেতার কাছ থেকে। অর্থাৎ বিতর্কের কেন্দ্র এখন খাবারের পছন্দ থেকে সরে ব্যবসা ও বাজারে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নে এসেছে। বিরোধী দলগুলোর আপত্তিও মূলত এ জায়গায়। তাদের মতে, বিক্রেতার নাম শুনে কেনাকাটার আহ্বান কার্যত সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। ভিএইচপির নির্দেশনা, বাঘেশ্বর বাবার মন্তব্য এবং এবারের পোস্টার, পরপর তিনটি ঘটনায় উৎসবের সময় সামাজিক আচরণ ও বাজার নিয়ে নতুন নতুন প্রস্তাব সামনে আসছে। প্রতিবারই বিতর্ক তৈরি হচ্ছে এবং বিজেপি নেতারা কখনো ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, কখনো দূরত্ব রাখছেন। তবে এ ক্ষেত্রে বিজেপির জেলা সভাপতি মন্তব্য এড়িয়ে গেছেন, যা বিরোধীদের সমালোচনার সুযোগ আরও বাড়িয়েছে।
তবে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। পোস্টারগুলো পুলিশ বা প্রশাসন সরিয়েছে কি না, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। সংখ্যালঘু ব্যবসায়ী বা তাঁদের প্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়াও প্রতিবেদনে নেই। কতগুলো পূজা কমিটি দোকান বসার ক্ষেত্রে এই অনুরোধ মানবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
উৎসবের মৌসুমে এ ধরনের আহ্বান সামাজিক সম্প্রীতির জন্য সংবেদনশীল। দুর্গাপূজা বাংলার সবচেয়ে বড় সার্বজনীন উৎসবগুলোর একটি, যেখানে নানা ধর্মের মানুষ কেনাকাটা, বিক্রি ও আয়োজনে যুক্ত থাকেন। তাই এ নিয়ে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও পূজা কমিটিগুলোর অবস্থান কী হয়, সেদিকে নজর থাকবে।
সূত্র: টিবিএস

