যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। নির্বাচনী অর্থায়নের নথি অনুযায়ী, জুলাইয়ের পর থেকে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সহায়তায় তিনি ২৭৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন।
এর ফলে চলতি নির্বাচনী চক্রে মাস্কের মোট রাজনৈতিক ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬৬ মিলিয়ন ডলারে। এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে এককভাবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দাতা হিসেবে তার নাম উঠে এসেছে।
তবে রিপাবলিকানদের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও একই সময়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরাও দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে।
নির্বাচনী অর্থায়নের তথ্য অনুযায়ী, মাস্কের এই বিপুল ব্যয়ের খবর আগেই প্রকাশ করেছিল নিউইয়র্ক টাইমস। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় অর্থদাতাদের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মাস্কের রাজনৈতিক সংগঠন আমেরিকা প্যাকের মাধ্যমে বিভিন্ন রিপাবলিকান সমর্থনকারী সংগঠনে অর্থ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হওয়া বর্তমান নির্বাচনী চক্রে জুলাইয়ের পর দেওয়া ২৭৬ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৫৮ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে সিনেট লিডারশিপ ফান্ড।
সিনেট লিডারশিপ ফান্ড রিপাবলিকানদের সিনেট নির্বাচনী প্রচারণায় সহায়তা করে এবং এটি সাউথ ডাকোটার রিপাবলিকান সিনেটর ও সিনেট মেজরিটি লিডার জন থুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
এছাড়া প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান প্রার্থীদের সহায়তাকারী কংগ্রেশনাল লিডারশিপ ফান্ড পেয়েছে ২০ মিলিয়ন ডলার। এই সংগঠনটি লুইজিয়ানার রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
মাস্কের নিজস্ব আমেরিকা প্যাক পেয়েছে ৭৬ মিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি টেক্সাসে রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্য অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের সিনেট নির্বাচনী প্রচারণায় সহায়তাকারী লোন স্টার লিবার্টি প্যাক পেয়েছে ১০ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া রিপাবলিকান গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশনকে ১০ মিলিয়ন ডলার এবং রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেলস অ্যাসোসিয়েশনকে ২ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন মাস্ক।
টেক্সাসের সিনেট নির্বাচন এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্যতম আলোচিত লড়াই। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটন এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
মাস্কের অর্থায়নের একটি অংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়েও ব্যবহার করা হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে এবারের নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাস্কের আমেরিকা প্যাক সাতটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী অঙ্গরাজ্য এবং প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় তিন ডজন আসনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সহায়তা করছে।
নির্বাচনী সংগঠনগুলোর তৃতীয় প্রান্তিকের ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের বাধ্যবাধকতার কারণে শিগগিরই আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাস্ক এমন কিছু সংগঠনের মাধ্যমেও অর্থ দিয়েছেন, যারা তাদের দাতাদের পরিচয় প্রকাশ করে না। আমেরিকা প্যাকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, চলতি নির্বাচনী চক্রে ব্যয় করা প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলারের একটি অংশ আগের নির্বাচনী কার্যক্রম বা অন্যান্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
এর মধ্যে উইসকনসিন সুপ্রিম কোর্টের এক ব্যর্থ প্রার্থীর প্রচারণায় সহায়তা এবং বাক্স্বাধীনতা ও অস্ত্র রাখার অধিকারের পক্ষে স্বাক্ষর করা নিবন্ধিত ভোটারদের জন্য ১ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার দেওয়ার একটি কর্মসূচিও ছিল।
ইলন মাস্কের রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কও রয়েছে। বিশেষ করে তার ব্যবসায়িক স্বার্থ, সরকারি চুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে মাস্কের প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সরকারি চুক্তির সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি পরিচালনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা এসব বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এর আগের নির্বাচনী চক্রেও মাস্ক বড় অঙ্কের রাজনৈতিক অর্থ ব্যয় করেছিলেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের সময় তিনি প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিলেন। ওই নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মাস্কের এই বিপুল অর্থায়ন আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় অর্থদাতাদের ভূমিকা ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যে এই অর্থায়নের প্রকৃত প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ধারণ করবে ভোটারদের সিদ্ধান্ত।

