রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করায় ইউরোপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার অভিযোগ, ইউরোপ বিপুল পরিমাণ রুশ জ্বালানি কিনছে।
সোমবার ইউরোপের দেশগুলো যখন রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করছিল, তখনই মহাদেশটির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন ট্রাম্প। রুশ প্রেসিডেন্টকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করতেই অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করছিল ইউরোপীয় দেশগুলো।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে কিয়েভের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পুতিনের আগ্রাসন সম্পর্কে মার্কিন কর্মকর্তাদের ‘সত্যটা বুঝতে হবে’।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিলে তার সঙ্গে মিত্রদের উত্তেজনা আবারও বেড়ে যায়। জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া থেকে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই সিদ্ধান্তের ফলে কয়েক মাস ধরে ওয়াশিংটন ও ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে চলে আসা একটি অভিন্ন অবস্থানের অবসান ঘটে। এত দিন তাদের মধ্যে ঐকমত্য ছিল, পুতিনকে আলোচনার টেবিলে আনতে হলে ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে হবে।
নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে।
জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ যে ভোগান্তিতে পড়েছেন, তার দায় ট্রাম্প বারবার রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার ওপর চাপিয়েছেন।
ইউক্রেনের সামরিক অভিযান বন্ধ করার চেষ্টা হিসেবে হোয়াইট হাউস সপ্তাহান্তে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়েছে বলে জানা গেছে। ইউক্রেনের মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র কিনে সেগুলো কিয়েভে পাঠাতে পারে—এমন একটি ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
ট্রাম্পের এই হুমকি ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থকদের জন্য বড় ধাক্কা। তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্যও রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের প্রতি আরও বেশি সমর্থন জানাতে এবং পুতিনের পরিবর্তে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়াতে ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা গত কয়েক মাস ধরে চালিয়ে আসছে এসব দেশ।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন জ্বালানির জন্য রাশিয়াকে ২৫০ বিলিয়ন ডলার [১৮৯ বিলিয়ন পাউন্ড] দিয়েছে। অথচ ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলো এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে চায় না।
তিনি আরও লেখেন, ‘আমি মার্কিন জনগণের স্বার্থেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। রোববার ট্রাম্প একতরফাভাবে এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। শীত আসার আগে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে রাতভর হামলার পর উদ্ধারকর্মীরা বিধ্বস্ত ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালান। এসব হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন।
পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার সকালেও নতুন করে হামলা হয়েছে। এসব হামলায় আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ২২ জন আহত হয়েছেন।
ট্রাম্প ইউক্রেনীয়দের নির্বাচনের মাধ্যমে জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন।
সোমবার জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধ চলাকালে নির্বাচন আয়োজন করা অসম্ভব। বিশেষ করে যখন দিন ও রাত—দুই সময়েই হামলা হচ্ছে।
তবে তিনি জানান, ইউক্রেন অন্তত ৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে পারলে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নিতে তিনি প্রস্তুত।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, নির্বাচনের দিন রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা বন্ধ রাখতে প্রস্তুত থাকবে। তার দাবি, কিয়েভ শুধু নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন, ক্ষত সারানো এবং আবার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চায়।
লুক্সেমবার্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইউক্রেনকে সহায়তা দিতে জব্দ করা রুশ সম্পদের ২১০ বিলিয়ন ইউরো বা ১৭৭ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে জানিয়েছে, এক বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাতটি দেশ এবং জোটটির পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস এই কৌশলকে সমর্থন করেছেন। বৈঠকটিতে রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের সিদ্ধান্তই প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন কূটনীতিক জানিয়েছেন, সম্পদ জব্দ করার ক্ষেত্রে বেলজিয়ামের উদ্বেগ দূর করতে একটি প্রস্তাব তৈরির বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশন সম্মত হয়েছে। বেলজিয়ামের আশঙ্কা, এই পদক্ষেপের কারণে তাদের ওপর ‘আইনি দায়ের সবচেয়ে বড় বোঝা’ এসে পড়তে পারে।
জব্দ করা রুশ সম্পদের বড় অংশ বেলজিয়ামে অবস্থিত ইউরোক্লিয়ার নামের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা আছে।
ইউক্রেনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রস্তাবটির আওতায় রাশিয়ার সম্পদ সরাসরি বাজেয়াপ্ত করতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং এসব সম্পদ থেকে অর্জিত আয় ইউক্রেনের আর্থিক চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বৈঠকের আগে জার্মানির একজন মন্ত্রী গুন্থার ক্রিশবাউম বলেন, জ্বালানি আমদানির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাশিয়াকে যে ডলারই দেবেন, সেই অর্থ কিয়েভকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালানোর অস্ত্র কেনায় ব্যয় করা হবে।
লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেস্তুতিস বুদ্রিস বলেন, ‘এই চুক্তি তেলজাত পণ্যের দাম কমাতে যেমন সহায়তা করে না, তেমনি আটলান্টিকের দুই পাশের দেশগুলোর ঐক্যও জোরদার করে না।’
একটি সূত্রের দাবি, রাশিয়ার জ্বালানি কিনে দেশটিকে আর্থিকভাবে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর জব্দ করা সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচনা নতুন করে গতি পেয়েছে।
জোটটির সদস্যদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার ছাড়ের মোকাবিলা করার উপায় খুঁজছিল। তাদের লক্ষ্য, পুতিনকে আন্তরিকভাবে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।
এদিকে, পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার অর্থের জোগান বন্ধ করার চেষ্টা হিসেবে প্রায় ১ হাজার ৬০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা চূড়ান্ত করার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
এক বিবৃতিতে কায়া কালাস বলেন, ‘রাশিয়া যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপ আবারও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দেখাচ্ছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকেরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।’
সোমবার ওয়ারশ নিরাপত্তা ফোরামে দেওয়া এক বক্তব্যে জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি একাধিকবার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, কিয়েভের বাহিনী চুক্তিটি মেনে চলেছে।
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে ট্রাম্পকে পুতিনের জবাব হচ্ছে রাশিয়ার হামলা।’
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের নেতৃত্বাধীন আলোচকেরা এক শোধনাগারের বদলে আরেক শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখার একটি সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ইউক্রেনের কাছে মাত্র একটি তেল শোধনাগার থাকায়, আর রাশিয়ার কাছে কয়েক ডজন থাকায় কিয়েভের কাছে প্রস্তাবটি কার্যত গুরুত্বহীন মনে হয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে রাজি হবে না, তা স্পষ্ট। রাশিয়া ‘জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত না হলে ইউক্রেনের বাহিনীও শিগগির পাল্টা হামলা শুরু করবে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা দ্য টেলিগ্রাফকে জানিয়েছেন, রাশিয়ার সাধারণ নাগরিকদের কাছে যুদ্ধের প্রভাব পৌঁছে দিতে সীমান্ত পেরিয়ে দেশটির ভেতরে হামলা চালানোই পুতিনকে আলোচনার টেবিলে বসানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউক্রেনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘রাশিয়া যদি বুঝতে পারে যে আমরা দেশটির আরও গভীরে আঘাত হানতে পারি, তাহলে দেখা যাক কী ঘটে। রাশিয়ার মানুষ যেকোনো ধরনের চাপ সহ্য করতে পারে—এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। দেখা যাক, তারা এই যুদ্ধ পছন্দ করে কি না।’
জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রকেও ইউরোপের মতো ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের ‘সত্যটা বুঝতে হবে’।
তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তি চাই। এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য সবার সঙ্গে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেরও অবসান চাই। ওই যুদ্ধ জ্বালানির দামসহ বিশ্বজুড়ে অনেক সমস্যার সৃষ্টি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এসব চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে—ইউরোপের সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও আমাদের সেই একই ঐক্যের অনুভূতি পাওয়া প্রয়োজন।’

