রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলের সাখালিন দ্বীপ থেকে এক জাপানি সাংবাদিককে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) জানিয়েছে, জাপানের একটি গোয়েন্দা সংস্থার জন্য রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সন্দেহে তাঁকে আটক করা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে এই অভিযোগে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
গত মঙ্গলবার এফএসবি জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকের নাম ইমাই ইউকি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনি জাপানের সংবাদপত্র হোক্কাইডো শিমবুনে কাজ করেন।
এফএসবির ভাষ্য, দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সাখালিনের প্রধান শহর ইউঝনো-সাখালিনস্ক থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে বিমানে করে মস্কোয় নেওয়া হয়। তদন্ত চলাকালে তাঁকে প্রায় দুই মাস আটক রাখার অনুমতি দিয়েছেন মস্কোর একটি আদালত।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশ পরা কয়েকজন কর্মকর্তা একটি হোটেলকক্ষে ওই সাংবাদিককে হাতকড়া পরাচ্ছেন। পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, দুই এফএসবি কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি বিমানে উঠছেন। মস্কোর আদালতে তাঁকে আসামিদের জন্য নির্ধারিত খাঁচার মতো কাঠামোর ভেতরে রাখা অবস্থায় দেখা যায়।
এদিকে মস্কোয় জাপানি দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাংবাদিককে আটকের খবর যাচাইয়ের চেষ্টা করছে জাপান সরকার। জাপানের সংবাদ সংস্থা কিয়োদো এ তথ্য জানিয়েছে।
গ্রেপ্তারের ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। গত আগস্টে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কুরিল দ্বীপপুঞ্জ সফর করার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই দ্বীপপুঞ্জ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জাপান এর মালিকানা দাবি করে। সাখালিন অঞ্চল গঠিত সাখালিন দ্বীপ ও কুরিল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণের চারটি দ্বীপ নিয়ে। জাপান এই দ্বীপগুলোকে ‘নর্দার্ন টেরিটরিজ’ নামে অভিহিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি, আর দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে অমীমাংসিত বিরোধকেই এর অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে দেখা হয়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দেশটিতে একাধিক বিদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক ইভান গারশকোভিচের আটক। ২০২৩ সালে আটক হওয়ার পর রাশিয়ার একটি আদালত তাঁকে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ১৬ বছরের কারাদণ্ড দেন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে বন্দিবিনিময়ের অংশ হিসেবে তিনি মুক্তি পান।
এই ঘটনার একটি বড় দিক হলো, অভিযোগের পক্ষে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেছে বলে জানা যায়নি। অভিযুক্ত সাংবাদিক বা তাঁর সংবাদপত্রের বক্তব্যও প্রতিবেদনে নেই। তাই অভিযোগের সত্যতা স্বতন্ত্র সূত্রে যাচাইয়ের সুযোগ আছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিদেশি সাংবাদিকদের গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটকের ঘটনা অনেক সময় কূটনৈতিক দর-কষাকষির প্রেক্ষাপটেও আলোচিত হয়েছে। জাপান-রাশিয়ার বিদ্যমান টানাপোড়েনের মধ্যে এ গ্রেপ্তার দুই দেশের সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
এখন নজর থাকবে জাপান সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ, দূতাবাস পর্যায়ে সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা আইনি সহায়তার সুযোগ মেলে কি না এবং মস্কোর আদালতে মামলার অগ্রগতির দিকে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

