পাকিস্তানের পেশোয়ার শহরে একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩৩ শিশুসহ অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন নারী শিক্ষকও রয়েছেন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় আরও বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। ভবনটির দুর্বল নির্মাণকাঠামো ও চরম অবহেলাকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারের দির কলোনি এলাকায় অবস্থিত আল-খাইর নামে একটি বেসরকারি স্কুলে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় লেডি রিডিং হাসপাতাল ৩৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে নাসিরুল্লাহ খান বাবর মেমোরিয়াল হাসপাতাল আরও একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে।
লেডি রিডিং হাসপাতালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৩৩ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৫ বছর বয়সী নারী শিক্ষক সামরিন বিবিও রয়েছেন। নিহত ও আহত শিশুদের বয়স ছয় থেকে ১৪ বছরের মধ্যে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
হাসপাতালটি থেকে ইতোমধ্যে ১৭ শিশুকে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে একজন শিক্ষক ও তিন শিশু এখনো সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অন্যদিকে নাসিরুল্লাহ খান বাবর মেমোরিয়াল হাসপাতাল জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর সেখানে ৩৩ জন শিক্ষার্থীকে আনা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
এর আগে উদ্ধারকারী সংস্থা রেসকিউ ১১২২-এর আঞ্চলিক পরিচালক আরিফ খাত্তাক জানিয়েছিলেন, ধসে পড়া স্কুল ভবনে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে একজন নারী শিক্ষকসহ মোট ২৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘ভবনটি ধসে পড়ার পর প্রাথমিকভাবে ১৬টি মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছিল। এরপর চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে অভিযান চলে এবং শেষ পর্যন্ত ২৯টি মরদেহ পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে একজন নারী শিক্ষক রয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে আমাদের জানানো হয়েছিল যে ভবনটি ধসে পড়েছে। কিন্তু এখানে পৌঁছানোর পর আমরা জানতে পারি, এটি তিনতলা একটি ভবন ছিল।’
উদ্ধারকারী এই কর্মকর্তা জানান, তিনতলা ভবনটি ছিল অস্থায়ী কাঠামোর। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন। তাঁদের প্রদেশের বড় হাসপাতালগুলোতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
আরিফ খাত্তাকের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার অভিযানে প্রায় ১০০ জন উদ্ধারকর্মী, ১৮টি অ্যাম্বুলেন্স এবং তিনটি ভারী যান অংশ নেয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি উর্দুর সংবাদদাতা বিলাল আহমেদ জানিয়েছেন, দুপুরের দিকে পেশোয়ার কর্তৃপক্ষ উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে দুর্ঘটনাস্থলে তখনো ধ্বংসস্তূপ পড়ে ছিল।
তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, স্কুলটি একটি তিনতলা ভবনে অবস্থিত। ভবনটির ছাদ প্রচলিত নির্মাণপদ্ধতির পরিবর্তে অস্থায়ী কাঠামো দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ধ্বংসাবশেষ দেখে মনে হচ্ছে, ওপরের একটি শ্রেণিকক্ষের ছাদ ভেঙে নিচের অংশে পড়ে। এরপর সেই ধ্বংসস্তূপ নিচতলায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে ছোট ছোট শিশুরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে।
এ ঘটনায় স্কুলটির মালিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে।’
বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
এ ছাড়া দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
পেশোয়ারের দির কলোনিতে এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও। তিনি আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দুর্ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছেন।
সরু রাস্তার কারণে উদ্ধারকাজে চরম দুর্ভোগ
স্কুলটি শহরের অত্যন্ত সরু একটি গলিতে অবস্থিত। সেখানে একসঙ্গে মাত্র একটি গাড়ি চলাচল করতে পারে।
এ কারণে উদ্ধারকারী দলকে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, ধ্বংসস্তূপ সরানো এবং আহত শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সোহাইল বলেন, ‘আমার বোন আমাকে ফোন করে বলেছিল, ভাই, তাড়াতাড়ি আসো। স্কুলের ছোট ছোট শিশুরা ছাদের নিচে চাপা পড়েছিল। আমি এবং এলাকার লোকজন দ্রুত কোদাল দিয়ে তাদের বের করার চেষ্টা করি।’
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। পরে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করে।
উদ্ধারকাজ চলাকালে স্কুলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, এমন ব্যক্তিদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। দুর্ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়।
এর আগে পেশোয়ারের উদ্ধার কর্মকর্তা বিলাল ফাইজি জানান, সকাল ৮টা ৪৮ মিনিটে তাঁদের নিয়ন্ত্রণকক্ষে স্কুলের ছাদ ধসে পড়ার খবর আসে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে পৌঁছে দেখি, ভবনটির একটি ছাদ আরেকটি ছাদের ওপর ধসে পড়েছে। ওই শ্রেণিকক্ষের শিশুরা এর নিচে চাপা পড়ে।’
ধসের নেপথ্যে ‘চরম অবহেলা’, তদন্তে পুলিশ
পেশোয়ার পুলিশের কর্মকর্তা মিয়া সাঈদ জানিয়েছেন, ধসে পড়া স্কুল ভবনটির নির্মাণকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল ছিল। সরু গলিতে অবস্থিত তিনতলা ভবনটির ছাদের স্ল্যাবগুলো নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনায় ভবনটির প্রতিটি তলায় একটি করে মোট তিনটি শ্রেণিকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কক্ষে প্রায় ১১০ জন শিক্ষার্থী ছিল বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
পুলিশের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ওপরতলার শ্রেণিকক্ষে ৩০ জন, মাঝের তলায় ৪০ জন এবং নিচতলায় ৪৫ জন শিক্ষার্থী ছিল।
মিয়া সাঈদ বলেন, পুরো ভবনটির ওপর ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি ভার ছিল। কংক্রিটের স্ল্যাব বা লিন্টেল কতটা ওজন বহন করতে পারে, তার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখনো লোকজনকে সরে যেতে বলছি, কারণ ভবনটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আরও ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এটি চরম অবহেলার ঘটনা।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, ভবন নির্মাণের বিধিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে এবং সব তথ্য সংগ্রহ করতে চাই।’
এর আগে পুলিশ নিশ্চিত করেছে, আল-খাইর স্কুলের মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পেশোয়ার পুলিশের অপারেশন বিভাগের জ্যেষ্ঠ সুপারিনটেনডেন্ট ফারহান আহমেদ বলেছেন, দির কলোনির আল-খাইর স্কুলটির ভবন ছিল ‘অত্যন্ত জরাজীর্ণ’।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্কুলটিতে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি শ্রেণিকক্ষে তখন প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী অবস্থান করছিল।
ফারহান আহমেদ আরও জানান, ভবনটি আগে কখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন করেছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।
এদিকে স্কুল ভবনের দুর্বল নির্মাণকাঠামো, অতিরিক্ত ভার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় সম্ভাব্য অবহেলার বিষয়গুলো সামনে আসায় দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: বিবিসি উর্দু, জিও নিউজ, ডন ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

