সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক রাজবধূ সন্তান অবহেলার অভিযোগ স্বীকার করার পর তাঁকে দুই বছরের কমিউনিটি অর্ডারের আওতায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন লন্ডনের একটি আদালত। গত জুনে পশ্চিম লন্ডনের একটি রাস্তায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল ৩২ বছর বয়সী মেহরা আল নাহিয়ানকে। তখন তাঁর তিন বছর বয়সী সন্তান অভিভাবকহীন অবস্থায় রাস্তায় ঘুরছিল। আদালত তাঁকে পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ৬ হাজার ১১৪ পাউন্ড জরিমানা করেছেন।
ঘটনাটি ঘটে গত ১৩ জুন, পশ্চিম লন্ডনের একটি রাস্তায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত মাদক কোকেন সেবনের পর মেহরা রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। এ সময় তাঁর সন্তান একা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একপর্যায়ে শিশুটি দ্রুতগতির যানবাহনের কাছাকাছি চলে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় পথচারীরা তার দিকে নজর দেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাত পৌনে দুইটার দিকে পুলিশ পৌঁছানো পর্যন্ত পথচারীরাই শিশুটির দেখাশোনা করেন। প্রায় ৩০ মিনিট অচেতন থাকার পর মেহরার জ্ঞান ফেরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তখন আশপাশের মানুষ উদ্বেগ জানালে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন।
ঘটনাটি নিয়ে লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে মামলা হয়। গত মঙ্গলবারের শুনানিতে মেহরা সন্তানের প্রতি অবহেলার অভিযোগ স্বীকার করেন। আদালতকে জানানো হয়, ঘটনার সময় তাঁর শরীরে মাদকের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে মেহরার আইনজীবী স্টিফেন ভুলো কেসি ভিন্ন দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, যেদিন মেহরাকে রাস্তায় অচেতন পাওয়া যায়, সেদিন তিনি কোকেন সেবন করেননি। এর আগের কয়েক দিন মাদক সেবনের কারণে তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলেন। আদালতকে আরও জানানো হয়, মেহরাকে তল্লাশি করে মাদক সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া গেলেও কোনো অবৈধ মাদক উদ্ধার হয়নি।
ঘটনার পর মেহরাকে মাদকাসক্তির চিকিৎসার জন্য একটি নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। তাঁর আইনজীবী আদালতকে জানান, নিজের আচরণের জন্য তিনি অনুতপ্ত। মাদকাসক্তি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ব্যাপারে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ওই দিনের ঘটনা যে গুরুতর ভুল ছিল, তা তিনি বুঝতে পেরেছেন বলেও আদালতে বলা হয়।
বিচারক জাস্টিস জনসন কেসি রায়ের সময় পথচারীদের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, পথচারীরা এগিয়ে না এলে শিশুটির বড় ক্ষতি হতে পারত। সে যানবাহনের ধাক্কায় আহত হতে পারত, হারিয়ে যেতে পারত কিংবা অচেনা কারও হাতে ক্ষতির শিকার হতে পারত। কাছাকাছি দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে শিশুটির মনে ভয় ও মানসিক আঘাত তৈরির আশঙ্কাও ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রায়ে আদালত মেহরাকে দুই বছরের কমিউনিটি অর্ডারের আওতায় রেখেছেন। এর অর্থ, তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়নি। বরং নির্ধারিত শর্ত মেনে সমাজের মধ্যে থেকেই তাঁকে নজরদারি ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে ৬ হাজার ১১৪ পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছে।
আদালতে আরও জানানো হয়, বিয়ের সূত্রে মেহরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপরিবারের সদস্য। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি যুক্তরাজ্যে প্রতি মাসে ৮ হাজার পাউন্ড সরকারি ভাতা পান।
ঘটনাটি আলোচনায় আসার পেছনে মূল কারণ অভিযুক্তের পারিবারিক পরিচয় হলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে মূল জোর পড়েছে শিশুর নিরাপত্তায়। বিচারকের বক্তব্যে স্পষ্ট, অভিভাবকের অবহেলা কত বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং সাধারণ পথচারীর সময়োচিত সহায়তা কীভাবে বড় বিপদ ঠেকাতে পারে। অন্যদিকে রায়ের ধরন থেকে বোঝা যায়, ব্রিটিশ আদালত এ ক্ষেত্রে শাস্তির চেয়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেই গুরুত্ব দিয়েছে।
আইনজীবীর দাবি ও আদালতে উপস্থাপিত তথ্যের মধ্যে একটি পার্থক্যও রয়েছে। মাদক সেবনের প্রভাবের অভিযোগ ছিল, কিন্তু আইনজীবী বলছেন ঘটনার দিন তিনি কোকেন নেননি। এ নিয়ে আদালতের পৃথক সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে বিষয়টি অভিযোগ ও আইনজীবীর বক্তব্য হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।

