ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামের জন্মদিন ছিল গতকাল ১৫ অক্টোবর। শৈশবে পরিবারের অভাব মেটাতে তিনি সংবাদপত্র বিলি করতেন। সেই বালকই পরে মহাকাশ গবেষণা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে পরিচিতি পান ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ নামে। ২০০২ সালে নির্বাচিত হন ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি। জনপ্রিয়তার কারণে দেশবাসী তাঁকে ডাকত ‘জনতার প্রেসিডেন্ট’। তাঁর এই যাত্রা অসংখ্য তরুণকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে জন্ম আবদুল কালামের। পুরো নাম আবুল পাকির জয়নুলাবদিন আবদুল কালাম। বাবা জয়নুলাবদিন নৌকা তৈরি ও ভাড়া দেওয়ার কাজ করতেন। পরিবারে সচ্ছলতা ছিল না। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি সংবাদপত্র বিলির কাজ শুরু করেন।
১৯৪১ সালে তাঁর দিন কাটত কঠিন রুটিনে। প্রতিদিন ভোর চারটায় উঠে যেতেন অঙ্কের শিক্ষকের কাছে। পড়া শেষে বিশ্রামের সুযোগ ছিল না। যেতে হতো তিন কিলোমিটার দূরের রেলস্টেশনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেখানে ট্রেন থামত না। চলন্ত ট্রেন থেকে ছুড়ে দেওয়া সংবাদপত্রের বান্ডিল কুড়িয়ে নিয়ে তিনি তা গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতেন। নাশতা সেরে যেতেন স্কুলে। সন্ধ্যায় আবার বের হতেন বিলি করা পত্রিকার বকেয়া অর্থ আদায়ে। অভাবের সঙ্গে এই লড়াইয়ে তিনি হারেননি।

শৈশব থেকেই আকাশের প্রতি টান ছিল তাঁর। এক অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছিলেন, স্কুলের শিক্ষক শিব সুব্রামনিয়াম আয়ার শ্রেণিকক্ষের বোর্ডে একটি পাখি এঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, পাখির মতো উড়তে পারবে কি না। কথাটি তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে। এরপর পাখির মতো ওড়ার স্বপ্ন থেকে যুদ্ধবিমানের পাইলট হওয়ার ইচ্ছা জাগে। ১৯৫৪ সালে তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফস কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন তিনি। এরপর বিমান প্রকৌশল পড়তে ১৯৫৫ সালে ভর্তি হন মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। সেখানে উড়োজাহাজের নকশা ও কারিগরি ব্যবস্থা নিয়ে হাতে-কলমে কাজের সুযোগ পান। উড়োজাহাজ কীভাবে তৈরি হয়, এর অংশগুলো কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে, তা জানার আগ্রহও তৈরি হয়।
পড়ার খরচ জোগানো পরিবারের জন্য কঠিন ছিল। তখন বড় বোন জোহরা নিজের সোনার গয়না বন্ধক রেখে তাঁর পড়ার ব্যয় মেটাতে সাহায্য করেন।
পড়াশোনা শেষে বিমানবাহিনীর পাইলট হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কালাম। কিন্তু নির্বাচিত হতে পারেননি। এটি ছিল তাঁর জন্য বড় হতাশার। পরে তিনি নিজেই বলেছেন, পাইলট না হলেও তাঁর কর্মজীবন প্রযুক্তি ও উড্ডয়নসংক্রান্ত কাজের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে।
১৯৫৮ সালে তিনি প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (ডিআরডিও) অধীন অ্যারোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে উড্ডয়নপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন। ১৯৬৯ সালে যোগ দেন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় (ইসরো)। তখন ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে উপগ্রহ উৎক্ষেপণযান তৈরির চেষ্টা করছে। কালাম দায়িত্ব পান স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল-৩ বা এসএলভি-৩ প্রকল্পের। এর লক্ষ্য ছিল নিজস্ব রকেটে উপগ্রহকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করা। তিনি প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৭৯ সালের ১০ আগস্ট এসএলভি-৩-এর প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ হয়। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয়। উপগ্রহ নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছাতে পারেনি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের পর এটি ছিল বড় ধাক্কা। তবে কালাম ও তাঁর সহযোদ্ধারা থেমে যাননি। উৎক্ষেপণের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা সমস্যার কারণ খুঁজে বের করেন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন আনেন।
ফল মেলে পরের বছর। ১৯৮০ সালের ১৮ জুলাই দ্বিতীয় পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে সফল হয় এসএলভি-৩। রোহিণী আরএস-১ উপগ্রহকে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ভারত নিজস্ব প্রযুক্তির উৎক্ষেপণযানে উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে। এটি কালামের কর্মজীবনের অন্যতম বড় অর্জন। এই অভিজ্ঞতা পরে আরও উন্নত উৎক্ষেপণযান তৈরির পথ খুলে দেয়।
এসএলভি-৩-এর সাফল্যের পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা ও বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞাকে নতুন দায়িত্বে কাজে লাগায়। ১৯৮২ সালে তিনি আবার ডিআরডিওতে ফেরেন। এবার তাঁর কাঁধে আসে ‘ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা আইজিএমডিপি। লক্ষ্য ছিল ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে ভারতকে স্বাবলম্বী করা। ১৯৮০-এর দশকে এই প্রযুক্তির ওপর আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু সরঞ্জাম পেতে ভারতকে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতেই নিজস্ব সক্ষমতা গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৮৩ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় পাঁচ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ শুরু হয়। এগুলো হলো ভূমি থেকে ভূমিতে আঘাত হানা ‘পৃথ্বী’, দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘অগ্নি’, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আকাশ’, স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘ত্রিশূল’ এবং ট্যাংকবিধ্বংসী ‘নাগ’। এই কর্মসূচিতে নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের ভূমিকার জন্যই তিনি ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ নামে পরিচিতি পান।
পারমাণবিক সক্ষমতা প্রতিষ্ঠাতেও তাঁর ভূমিকা ছিল। ১৯৯৮ সালের মে মাসে রাজস্থানের পোখরানে ‘পোখরান-২’ নামে দ্বিতীয় দফার পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের সচিব হিসেবে কালাম ছিলেন এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নজর এড়াতে প্রস্তুতি নেওয়া হয় অত্যন্ত গোপনে। বিজ্ঞানীরা ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। কালামসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী সেনা কর্মকর্তার পোশাক পরে পরীক্ষাস্থলে যেতেন। ওই বছরের ১১ ও ১৩ মে মোট পাঁচটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটে। এর মাধ্যমে ভারত প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ঘোষণা করে।
তাঁর মেধা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা মহাকাশ প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্ট লাঘবেও কাজে লাগতে পারে। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ড. সোমা রাজুর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেন, করোনারি স্টেন্ট বা রিং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে তা অনেক সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। তিনি দেশীয় প্রযুক্তিতে স্টেন্ট তৈরির উদ্যোগ নেন, যা ‘কালাম-রাজু স্টেন্ট’ নামে পরিচিত। ১৯৯৮ সালে তা বাজারে আসে। লক্ষ্য ছিল হৃদ্রোগের চিকিৎসার ব্যয় কমানো।
পোলিও আক্রান্ত শিশুদের জন্যও কাজ করেছেন কালাম। তখন তাদের হাঁটার জন্য যে ক্যালিপার ব্যবহৃত হতো, তার ওজন ছিল প্রায় তিন কেজি। ভারী এই ক্যালিপার পরে হাঁটতে শিশুদের কষ্ট হতো। বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি দলের সঙ্গে হালকা ক্যালিপার তৈরির কাজে যুক্ত হন। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত একটি উপাদান কাজে লাগিয়ে এর ওজন তিন কেজি থেকে কমিয়ে প্রায় ৩০০ গ্রামে নামিয়ে আনা হয়। এই কৃত্রিম পা পরে শত শত শিশু যখন মাঠে দৌড়াতে শুরু করল, তিনি বলেছিলেন, মহাকাশে রকেট পাঠানোর চেয়েও এই শিশুদের মুখে হাসি দেখা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
২০০২ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থনে তিনি ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাজনীতির বাইরে থেকে আসা একজন বিজ্ঞানীর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসা ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হন। ২০০২ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থী ও তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগকে গুরুত্ব দেন। দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাঁদের প্রশ্ন শুনতেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে ভাবতে উৎসাহ দিতেন। সহজ জীবনযাপন ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে পারার গুণে তিনি জনপ্রিয় হন।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শেষে তিনি শিক্ষাদান, লেখালেখি ও তরুণদের অনুপ্রাণিত করার কাজ চালিয়ে যান। নিজের জীবন ও কর্মের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন একাধিক বইয়ে। এর মধ্যে আত্মজীবনী ‘উইংস অব ফায়ার’ বিশেষভাবে পরিচিত।
২০১৫ সালের ২৭ জুলাই মেঘালয়ের শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তৃতা দেওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন কালাম। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেদিন সন্ধ্যায় সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল ৮৩ বছর।
সব মিলিয়ে কালামের জীবন দেখায়, অভাব বা ব্যর্থতা শেষ কথা নয়। পাইলট হতে না পারার হতাশা, প্রথম উৎক্ষেপণের ব্যর্থতা কিংবা আর্থিক সংকট, কোনোটাই তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি ধাক্কা থেকে শিখে তিনি এগিয়েছেন। একই মেধা তিনি কাজে লাগিয়েছেন প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও মানবকল্যাণ, তিন ক্ষেত্রেই। এ কারণেই বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে আছে তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগানোর ভূমিকা। তবে ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন মূল্যায়নও আছে, যা এই প্রতিবেদনের আলোচ্য নয়।

