দ্য গার্ডিয়ান
ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে পশ্চিমা জোটের ভেতরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা, গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি এবং রাশিয়ার জ্বালানি কেনার উদ্যোগ—এসব পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের স্বার্থকেই এগিয়ে নিচ্ছে বলে মনে করছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড।
তাঁর মতে, ইউরোপের দেশগুলোর এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন আরও জোরালো করা প্রয়োজন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ফ্রিডল্যান্ড লিখেছেন, ট্রাম্প বারবার তাঁর অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেও পশ্চিমা দেশগুলো এর তাৎপর্য পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছে না। তাঁর বিশ্লেষণে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখন আর মুক্ত বিশ্বের নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে কাজ করছেন না; বরং পশ্চিমা জোটের প্রধান প্রতিপক্ষ রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকেই এই অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল বলে মনে করেন ফ্রিডল্যান্ড। ওই বৈঠকে জেলেনস্কিকে অপমান করে ট্রাম্প বলেছিলেন, দর-কষাকষির জন্য তাঁর হাতে কোনো তাস নেই। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেনের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্টারলিংকে সীমাবদ্ধতা, চাপে ইউক্রেন
ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভরতার ঝুঁকি সম্প্রতি আরও স্পষ্ট হয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন পরিচালনায় ব্যবহৃত ইলন মাস্কের স্টারলিংক ব্যবস্থার একটি সংস্করণে গতি সীমিত করার ঘটনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে চলা ড্রোনের ক্ষেত্রে আরোপিত সীমাবদ্ধতা ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। এতে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার গভীরে হামলা চালানোর সক্ষমতা কমার পাশাপাশি রুশ ড্রোনের আক্রমণ থেকে রাজধানী কিয়েভকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ফ্রিডল্যান্ড লিখেছেন, সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারশিল্ড ব্যবস্থার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের নির্দেশ এসেছিল হোয়াইট হাউস থেকে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছিলেন, এ সিদ্ধান্তের কারণে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
ফ্রিডল্যান্ডের বিশ্লেষণে, এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে সামরিক ও যোগাযোগব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ওয়াশিংটনের একটি সিদ্ধান্তেই ইউক্রেনের মতো দেশের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার জন্য আর্থিক সুবিধার অভিযোগ
ইউক্রেনকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর চাপ কমানোর কিছু পদক্ষেপও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফ্রিডল্যান্ডের নিবন্ধে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের আগাম গোয়েন্দা সতর্কতা দেওয়ার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একই সময়ে মস্কোর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের রুশ ডিজেল তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান বাড়াতে পারে।
ফ্রিডল্যান্ড মনে করেন, রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের এই অবস্থানের পেছনে ব্যক্তিগত স্বার্থ, আদর্শিক অবস্থান কিংবা কর্তৃত্ববাদী নেতাদের প্রতি তাঁর আকর্ষণ—বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে কারণ যা-ই হোক, পশ্চিমা জোটের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের পরও কাটবে না উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেও ইউরোপের দেশগুলোর নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেছেন ফ্রিডল্যান্ড। তাঁর আশঙ্কা, কংগ্রেসের বিরোধিতার মুখে ট্রাম্প আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন। এমনকি ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হলেও তাঁর রাজনৈতিক ধারা বা ‘ট্রাম্পবাদ’ পশ্চিমা জোটের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
লেখকের মতে, ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন আর পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা সম্ভব নয়। স্টারলিংক-সংক্রান্ত ঘটনা দেখিয়েছে, মার্কিন প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর সক্ষমতা ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে হঠাৎ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলোকে নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে আরও জোরালো সমর্থন দিয়ে যেতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন এলেও দেশটির প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে না পড়ে।
ফ্রিডল্যান্ডের মূল সতর্কবার্তা হলো, পশ্চিমা জোটের ঐক্যকে চিরস্থায়ী বা অটুট ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন পুরো জোটের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। তাই ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক বিশ্বপরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

