আল-জাজিরা
জায়নবাদের কঠোর সমালোচনা করে ইসরায়েলে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন দেশটির প্রভাবশালী কট্টরপন্থী ইহুদি ধর্মীয় নেতা ডভ লান্দো। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ৯৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় পণ্ডিতকে বলতে শোনা যায়, জায়নবাদী আদর্শ ইহুদিদের জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে।
তাঁর মতে, ইহুদিদের আলাদা কোনো রাষ্ট্র না থাকলেও বরং ভালো হতো।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে লান্দোর এমন মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশটির রাজনীতিকেরা। এবারের নির্বাচনে কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণেও এসব ধর্মীয় দলের অবস্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
ডভ লান্দোকে ইসরায়েলের লিথুয়ানীয় ধারার কট্টরপন্থী ইহুদি সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই ধর্মীয় নেতা লিথুয়ানীয় ইহুদি ঐতিহ্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। তিনি বনে ব্রাক শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী ইহুদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ‘ইয়েশিভা’র প্রধান। পাশাপাশি শীর্ষ ধর্মীয় নেতাদের নীতিনির্ধারণী পরিষদেরও অন্যতম সদস্য তিনি।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক দল ‘দেগেল হাতোরাহ’র আধ্যাত্মিক নেতাও ডভ লান্দো। দলটি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের শরিক ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) জোটের অংশ।
সম্প্রতি ইসরায়েলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওটি প্রায় এক বছর আগের। সেখানে লান্দো জায়নবাদ, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এবং ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, জায়নবাদের কারণে আরবদের মধ্যে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, এই মতবাদ ইহুদিদের জাগতিক ও আত্মিক—উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁর মতে, আলাদা রাষ্ট্র ছাড়াও আরবদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা সম্ভব। এমনকি আন্তর্জাতিক কিংবা ফিলিস্তিনি শাসনব্যবস্থার অধীনেও ইহুদিরা তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ পেতে পারতেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জায়নবাদে বিশ্বাসী ধর্মীয় সেনাদেরও কঠোর সমালোচনা করেন লান্দো। তিনি বলেন, “এই সেনারা প্রাণ হারাচ্ছেন, কারণ তাঁদের রাবাইরা তোরাহ বিকৃত করে শেখাচ্ছেন।”
তাঁর মতে, অনেক সামরিক অভিযান মানুষের জীবন রক্ষার জন্য পরিচালিত হয় না; বরং রাষ্ট্রের অহংকার ও মর্যাদা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে চালানো হয়।
ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদেরও সমালোচনা করেছেন এই ধর্মীয় নেতা। তাঁর দাবি, ধর্মনিরপেক্ষদের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর ভাষায়, তারা ধর্মদ্রোহ ও অবিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে।
লান্দোর এই বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা। বিশেষ করে নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের নেতারা তাঁর মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন।
বিরোধী জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী এবং ইয়াশার দলের প্রধান গাদি আইজেনকোট বলেন, লান্দোর এই অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য সরাসরি জায়নবাদবিরোধিতার বহিঃপ্রকাশ।
প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ মন্তব্যটিকে প্রতিটি ইহুদির জন্য ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের মতে, লান্দোর বক্তব্য ইহুদিবিদ্বেষী, জায়নবাদবিরোধী এবং সরাসরি সেনাবাহিনীর ওপর আঘাত।
লান্দোর ভিডিও নিয়ে নেতানিয়াহু এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে গত জুলাইয়ে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বিরোধিতা করতে গিয়ে লান্দো হত্যার উসকানির অভিযোগ তুলেছিলেন। সে সময় তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করেছিলেন নেতানিয়াহু।
বর্তমানে বিরোধী নেতারা স্পষ্ট দাবি তুলেছেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকারে যেন ইউটিজেকে রাখা না হয়। এই দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করায় নেতানিয়াহুরও সমালোচনা করছেন তাঁরা।
ডেমোক্র্যাটস দলের প্রধান ইয়ার গোলান সরাসরি অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু নীরব রয়েছেন একটি বিশেষ কারণে। তাঁর মতে, লান্দো ও তাঁর অনুসারীদের সমর্থন ছাড়া নেতানিয়াহুর সরকার টিকে থাকতে পারবে না। গোলানের অভিযোগ, নেতানিয়াহুর কাছে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; জায়নবাদ, সবার সমান দায়িত্ব কিংবা সেনাদের আত্মত্যাগের মূল্য তাঁর কাছে মুখ্য নয়।
ইউটিজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়তে পারে। আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় টিকে থাকতে তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের তুলনায় তাঁর জোট পিছিয়ে রয়েছে। চ্যানেল ১২-এর একটি জরিপ অনুযায়ী, ইউটিজে একাই পার্লামেন্টে আটটি আসন পেতে পারে।
ইসরায়েলবিষয়ক বিশ্লেষক ইহাব জাবারিনের মতে, পরিস্থিতি বেশ জটিল। তিনি বলেন, “নেতানিয়াহু কড়া জবাব দিলে সরকার টেকাতে জরুরি এই কট্টরপন্থীদের সমর্থন হারাবেন। আবার চুপ করে থাকলে বিরোধীরা ডানপন্থী ভোটারদের বোঝাবে, নিরাপত্তা আর জায়নবাদের বুলি আওড়ানো নেতা আসলে এমন এক ধর্মীয় গোষ্ঠীর দয়ায় টিকে আছে, যারা খোদ জায়নবাদকেই মানে না।”

