জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। শনিবার, ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশটির বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযানে ১২০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫০ জন পুলিশ সদস্য।
রোববার রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দেশজুড়ে বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার। তবে দেশটির অন্যতম বড় শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, এই সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ।
বিক্ষোভের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও বিভিন্ন স্থানে একদল মানুষ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন। সরকারি ভবন, বিপণিবিতান, সুপারমার্কেট ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। কয়েকটি শহরে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও।
মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে বিক্ষোভের মধ্যে সিটি হলে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা মরিস বারাত জানিয়েছেন, আগুনে ভবনটির ছাদ ধসে নিচের তলাগুলোর ওপর পড়ে। পশ্চিম দিকের অংশ ছাড়া ভবনটির বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
১৪৩ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটির ক্ষয়ক্ষতিকে ঐতিহ্যের জন্য বড় বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি।
মার্সেই শহরেও বিক্ষোভকারীরা সিটি হলে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তাঁরা নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে ভবনের দরজায় আঘাত করেন এবং দেয়ালে নৈরাজ্যবাদের প্রতীক আঁকেন। পরে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয়। লিয়ঁ শহরে একটি পর্যটন কার্যালয়েও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিল একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও আতশবাজি ছোড়েন। এ সময় একটি ব্যাংকে হামলা এবং ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
শহরের বিভিন্ন স্থানে ময়লার পাত্র ও গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কিছু এলাকায় আগুন পাশের ভবনেও ছড়িয়ে পড়ে। বুলেভার্দ ম্যাজেন্তা এলাকায় একাধিক দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
বিক্ষোভকারীদের একটি দল গ্যালারি লাফায়েত বিপণিবিতানে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের নিম্নআয়ের কয়েকটি এলাকার বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। শিক্ষক অনুপস্থিতি, প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকা এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভ থেকে প্রতিবাদের সূচনা হয়।
পরে সেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিতে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আয়বৈষম্য এবং সরকারি খাতে ব্যয় কমানোর বিরুদ্ধেও মানুষ প্রতিবাদে যোগ দেন।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়ে আরও শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা, মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি এবং জনসেবামূলক খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
প্যারিসের ১৯ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী লোলা জানিয়েছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। জ্বালানির দামও অনেক বেশি। শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা ও শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন স্থানে হামলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ২০১৮ সালে শুরু হয়েছিল ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলন। সেই আন্দোলনে প্রতিবাদকারীদের পরিচিত পোশাক ছিল উজ্জ্বল হলুদ নিরাপত্তাবস্ত্র।
এবারের বিক্ষোভেও অনেকে একই ধরনের হলুদ পোশাক পরে রাজপথে নেমেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে মানুষের উপস্থিতি ২০১৮ সালের আন্দোলনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেয়েও বেশি ছিল। তবে ২০২৩ সালে পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভের তুলনায় এবারের জনসমাগম কম ছিল।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের মাধ্যমে সরকারকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা যাবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে সহিংসতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাওয়া ব্যক্তিদের সরকার ভয় পাবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের অভিযোগ, কিছু অপরাধী বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে লুটপাটে অংশ নিয়েছে। তাঁদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও হামলাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার অঙ্গীকার করেছেন। তাঁর মতে, যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার ক্ষুণ্ন করছে, তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।
বিক্ষোভ দমনে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে। পুলিশের অভিযানে আহত হওয়ার অভিযোগগুলোও তদন্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নজরদারি সংস্থা পুলিশের বিরুদ্ধে অন্তত দুই ডজন সহিংসতার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।
শনিবারের সংঘর্ষে এক ব্যক্তি হাত হারিয়েছেন বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ নিশ্চিত করেছেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের ছোড়া একটি বিস্ফোরক নিয়ন্ত্রণমূলক অস্ত্র তুলে নেওয়ার সময় তাঁর হাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর আগে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত হারানোর ঘটনার পর পুলিশের ব্যবহৃত একই ধরনের একটি অস্ত্রের ব্যবহার স্থগিত করা হয়েছিল। তবে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সেটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু জানিয়েছেন, সংঘর্ষে ১৫০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশের একটি ইউনিয়নের দাবি, বিভিন্ন স্থানে সদস্যদের লক্ষ্য করে লাঠি ও ইট ছোড়া হয়েছে।
আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে জীবনযাত্রার ব্যয়, আয়বৈষম্য, সরকারি পরিষেবার মান এবং রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে জনঅসন্তোষ সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
একই সময়ে সরকারি ঋণ কমানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে দেশটির প্রশাসন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ঋণ নেওয়ার ব্যয় দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ফলে এবারের বিক্ষোভ শুধু মূল্যবৃদ্ধি কিংবা শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরকারি পরিষেবার মান, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সরকারের নীতির প্রতি মানুষের অসন্তোষও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সহিংসতার দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উত্থাপিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিগুলোর বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।

