বিশ্ববাজারে সরবরাহের উদ্দেশ্যে রাশিয়ার প্রথম তেলবাহী ট্যাংকার বন্দর ছেড়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। শনিবার, ১৭ অক্টোবর রাশিয়ার রাজনৈতিক টক শো ‘সলোভিওভ লাইভ’-এ তিনি এ কথা বলেন। নোভাকের দাবি, তেল বিক্রিতে রাশিয়ার কোনো সংকট নেই, বরং দেশটির কাছ থেকে তেল কিনতে আগ্রহী ক্রেতা অনেক।
নোভাক জানান, প্রথম ট্যাংকারটিতে ইতোমধ্যে তেল বোঝাই করা হয়েছে এবং সেটি ডিকসন বন্দর ছেড়ে গেছে। আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার ক্রাসনোইয়ারস্ক অঞ্চলের কারা সাগরের উপকূলে এই বন্দর অবস্থিত। তাঁর বক্তব্য থেকে ট্যাংকারটি কোথায় যাচ্ছে, কী পরিমাণ তেল বহন করছে বা ক্রেতা কারা, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই ঘোষণার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে গত ৯ অক্টোবর। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর ডিজেল সরবরাহ নিয়ে একটি চুক্তির কথা জানান। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে সম্মত হয়েছে মস্কো। পুতিনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।
তবে এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর আশঙ্কা, রুশ ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ শিথিল করা হলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মস্কোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়তে পারে। অর্থাৎ জ্বালানি সরবরাহের এই সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূরাজনৈতিক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
বিশ্ববাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নোভাক বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ থেকে ৬০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতির কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। বাজার পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা থাকলেও দাম এখনো উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নোভাকের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দাম আরও বাড়তে পারে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিকভাবে চালু করা গেলে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে বাজারে ভারসাম্য ফিরতে পারে। তবে বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল রাখতে তেলের মজুত ব্যবহারের সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে বলেও তিনি সতর্ক করেন। এতে বোঝা যায়, বর্তমান সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম, আর জরুরি মজুতও সীমাহীন নয়।
গ্যাস নিয়েও কথা বলেন রুশ উপপ্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া’ পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে বছরে ৩ হাজার ৯০০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রত্যাশা করছে রাশিয়া। সরবরাহ সক্ষমতা বাড়িয়ে ৪ হাজার ৪০০ কোটি ঘনমিটারে নেওয়ার বিষয়েও চুক্তি রয়েছে বলে তিনি জানান। পশ্চিমা বাজারে ঝামেলার মুখে রাশিয়া যে এশিয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকছে, এ বক্তব্যে তারই ইঙ্গিত মেলে।
ইউরোপে নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ আবার চালুর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখনো আছে বলে দাবি করেন নোভাক। তাঁর তথ্যমতে, বিস্ফোরণ ও কথিত সন্ত্রাসী হামলার কারণে নর্ড স্ট্রিমের চারটি পাইপলাইনের মধ্যে তিনটি অচল। একটি অক্ষত থাকায় সেটির মাধ্যমে সরবরাহ সম্ভব। তবে সরবরাহ পুনরায় শুরু হবে কি না, তা নির্ভর করছে ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনগুলোর ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপীয় ক্রেতাদের সিদ্ধান্তের ওপর।
এসব বক্তব্য রাশিয়ার সরকারি অবস্থান থেকে দেওয়া, স্বাধীন সূত্রে যাচাই করা নয়। ঘাটতির পরিমাণ, দামের গতি ও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে অন্যান্য বিশ্লেষক বা সংস্থার মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে। তবু বার্তাটি স্পষ্ট: রাশিয়া নিজেকে বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে তুলে ধরছে, আর বাজারে সংকটের দায় মূলত হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তার ওপর চাপাচ্ছে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি উদ্বেগের। তেলের দাম উচ্চ থাকলে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। এখন নজর থাকবে ট্যাংকারটি কোথায় পৌঁছায়, ট্রাম্প-পুতিন চুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিতে কোনো উন্নতি ঘটে কি না, সেদিকে।

