রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানের মধ্যেই দেশটিতে চলতি বছরের অন্যতম বড় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রাতভর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইউক্রেনের ১ হাজার ১৫টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল সেন্ট পিটার্সবার্গের তেল টার্মিনাল। বছরে সর্বোচ্চ ১ কোটি ২৫ লাখ টন তেল পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে এই টার্মিনালের। ইউক্রেনের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্ট জানিয়েছে, হামলার পর টার্মিনাল এলাকায় আগুন ধরে যায়।
রাশিয়ার বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান ওজোন জানিয়েছে, সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি সরবরাহকেন্দ্রেও হামলা হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাসিক ভবনও।
ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির সম্পর্কে টানাপোড়েন
রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সম্পর্কে উত্তেজনা বেড়েছে। গত সপ্তাহে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প।
এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেল ও ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই ওয়াশিংটন এ উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে কিয়েভ ও মস্কো—কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এমন সমঝোতার কথা স্বীকার করেনি।
ইউক্রেন সাময়িকভাবে এ ধরনের হামলা বন্ধ রাখলেও পরে আবার শুরু করেছে। কিয়েভের অভিযোগ, রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা ও শহরগুলোতে হামলা অব্যাহত রেখেছে।
জেলেনস্কি রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনের জ্বালানি, তেল ও গ্যাস খাতে ৭৬ বার হামলা চালিয়েছে।
তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা বা সমঝোতার উদ্যোগের জবাবে রাশিয়া পাল্টা পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং এসব সুযোগকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক সুবিধা হিসেবে দেখছে মস্কো।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে হামলার মধ্যেই ইউক্রেনে প্রাণহানি
ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দেশটিতে ১১ জন নিহত এবং প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন। ওদেসা অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে, রাশিয়ার ডিজেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার কংগ্রেসের মাধ্যমে আরোপিত ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে রাশিয়াকে অব্যাহতি দেওয়ার পদক্ষেপও নিয়েছে ওয়াশিংটন। এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের কয়েকজন সদস্যও।
ড্রোন পরিচালনায় স্টারলিংক নিয়ে উদ্বেগ
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও জানিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে স্বল্পপাল্লার ড্রোন পরিচালনার জন্য স্টারলিংক ব্যবহারে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা সীমিত রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনের গতি ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটার ছাড়ালে স্টারলিংক সংযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জেলেনস্কি বলেন, স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড ব্যবহার করে জেটচালিত শাহেদ ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও ইউক্রেন বর্তমানে সমস্যার মুখে রয়েছে। স্টারশিল্ড মূলত সরকার ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রয়োজনের জন্য তৈরি উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা।
তাঁর অভিযোগ, ইউক্রেনের ভূখণ্ডে এসব বিধিনিষেধ কার্যকর থাকলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে তা প্রযোজ্য নয়। এ কারণে তিনি পরিস্থিতিকে ইউক্রেনের আত্মরক্ষা ও জনগণকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সীমিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন স্টারলিংক ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এর আগে কিয়েভ জানিয়েছিল, মিত্রদের কাছ থেকে আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ছে তারা। আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে সতর্ক করতে যুক্তরাষ্ট্রের উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগ ও নজরদারি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের নতুন করে বড় হামলা এবং ইউক্রেনের ওপর রুশ আক্রমণ অব্যাহত থাকায় যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ায় ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা ও আত্মরক্ষার সক্ষমতা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

