যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কোনো প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন অবস্থান নিতে পারেন বলে সতর্ক করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে ভারত ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মতো রাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন জোট গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। দ্য হিন্দু
রোববার (১৮ অক্টোবর ২০২৬) ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতি তুলে ধরার একটি অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন নেতানিয়াহু। আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের মাত্র নয় দিন আগে দেওয়া তাঁর এই বক্তব্যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তার বিষয়টি সামনে এসেছে।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রতি জোরালো সমর্থন জানান। ইসরায়েলের নির্বাচনের কয়েক দিন আগে প্রকাশ্যেই নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ট্রাম্প।
অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেন, “দুই বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় এমন কোনো প্রেসিডেন্ট আসতে পারেন, যিনি পুরুষ বা নারী—যেকোনো একজন হতে পারেন এবং ইসরায়েলের প্রতি অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন হবেন।”
এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আপনারা তখন কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন? যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে এগোবেন? এর বাইরেও কী ধরনের সমাধান প্রয়োজন হবে?”
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের বাকি সময়টুকু কাজে লাগিয়ে দেশটির অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, “প্রথমত, আগামী দুই বছর এবং তার পরের দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের যথাসাধ্য সবকিছু করতে হবে। পরিস্থিতি ভালো হোক বা খারাপ, এ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।”
এরপর ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে নেতানিয়াহু বলেন, “দ্বিতীয়ত, আমাদের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে জোট গড়ে তুলতে হবে। আমি এখন আমাদের অঞ্চল ও এর বাইরের অনেক দেশের সঙ্গে এ কাজ করছি। ভারত কোনো ছোট দেশ নয়। এ রকম আরও অনেক দেশ রয়েছে।”
ইসরায়েলের মিত্রদেশের পরিসর বাড়ানোর আরেকটি সম্ভাবনা হিসেবে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টিও তুলে ধরেন নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, “লাতিন আমেরিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ব্রাজিলে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের মিত্রদেশের পরিসর বাড়াতে হবে এবং এমন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে সবাই আমাদের প্রয়োজনীয় বলে মনে করে।”
বিশ্বজুড়ে ইসরায়েল বিচ্ছিন্ন নয়—এমন বক্তব্য তুলে ধরতে নেতানিয়াহু প্রায়ই ভারতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথাও সামনে আনেন তিনি। নিজের সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যের প্রমাণ হিসেবেও এই সম্পর্ককে তুলে ধরেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এবং দেশটির মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসায় চলতি বছরের মে মাসে নেতানিয়াহু একটি বহুল আলোচিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের ‘অনন্য সম্পর্ক’ রয়েছে। ভারতীয়দের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি ‘পাগলের মতো ভালোবাসা’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলের অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতাদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি ক্রমবর্ধমান অনীহার পেছনে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দুই প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক প্রায়ই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। তবে এসব মতবিরোধকে নিজের সমর্থকদের সামনে দৃঢ় নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে তিনি প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে এই অবস্থান। তাঁদের ধারণা, এটি তাঁর নির্বাচনী সাফল্যের অন্যতম কৌশলও। নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী।
তবে আসন্ন নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট ঘোষিত নিরাপত্তানীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর এই উদ্যোগ দেশের নিরাপত্তা নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার পরিবর্তে একটি ফাঁপা রাজনৈতিক আয়োজন।
আইজেনকোট বলেন, “নির্বাচনের মাত্র নয় দিন আগে এবং ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যর্থতা ও বিপর্যয়ের তিন বছর পর নেতানিয়াহু জনগণের সামনে তাঁর ‘নিরাপত্তানীতি’ তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ যুদ্ধের সব রণাঙ্গন এখনো খোলা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “দুটি ফাঁপা পাতায় ভরা কিছু স্লোগান তুলে ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে নিরাপত্তানীতির কোনো সম্পর্কই নেই। এসব বিষয় অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে নেতানিয়াহু ইসরায়েল রাষ্ট্রকে কতটা কৌশলগত শূন্যতার মধ্যে রেখে গেছেন। একই সঙ্গে এগুলো ইসরায়েলের নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি তাঁর অবহেলাও প্রকাশ করে।”
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান আইজেনকোট নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং মানুষের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন।
তিনি বলেন, “এটাই নেতানিয়াহুর কৌশল। মানুষের ধারণাকে নিজের মতো করে প্রভাবিত করা, তাদের ভয় দেখানো এবং আজ রাতে তাঁর নির্বাচনী প্রচারকে ঘিরে থাকা মিথ্যা ও বর্ণবাদী বক্তব্যের ধারাবাহিকতা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা।”

