মিডল ইস্ট আই
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থান করছিলেন আন্তোনিয়া মালভি। কয়েক দিন আগেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া নারী ও শিশুদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম এমইইকে মালভি বলেন, “নারীরা সারাদিন আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতেন। তাদের সঙ্গে ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু তাদের গল্প শুনতে গিয়ে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল, তা হলো- তারা আমার কাছে ন্যায়বিচার চাইছিলেন।”
জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানকারী মিশনের পাঠানো প্রথম তিনজন তদন্তকারীর একজন ছিলেন মালভি। তার দায়িত্বের মধ্যে ছিল যৌন সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করা।
নয় বছর পর সেই সাক্ষ্য ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি মামলাটি এখন শেষ পর্যায়ে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) সিদ্ধান্ত দেবে বলে আশা করা হচ্ছে- মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা করেছে কি না।
বর্তমানে রোহিঙ্গা সাক্ষীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের (LAW) নির্বাহী পরিচালক মালভি বলেছেন, বিচারকরা যদি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রায় দেন, তাহলে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি গণহত্যা সংঘটনের দায়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সম্পূর্ণ দায়ী করার এটিই হবে প্রথম ঘটনা।
অনেক রোহিঙ্গার কাছে এই রায় শুধু অতীতের অপরাধের বিচার নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ। লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের (LAW)-এর গবেষকদের একজন শরণার্থী বলেন, “আমাদের সমস্যার মূল কারণ সমাধান করতে হবে। আমাদের জন্য সর্বোত্তম ন্যায়বিচার হলো সেই মূল কারণটির সমাধান।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার রায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান অন্য গণহত্যা মামলাগুলোর ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গাজা মামলা, যেখানে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং নিশ্চিত নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজারে পৌঁছেছে।
ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক মাইকেল বেকার বলেছেন, এই মামলা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সামনে “গণহত্যা-সংক্রান্ত আইনকে আরও স্পষ্ট ও বিকশিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ” তৈরি করেছে। তার মতে, এর রায় দক্ষিণ আফ্রিকার মামলার ওপরও “বড় ধরনের প্রভাব” ফেলবে।
কয়েক দশকের নিপীড়ন থেকে আদালত পর্যন্ত
প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে আসছে। উত্তর রাখাইন ছিল দেশটির একমাত্র অঞ্চল, যেখানে রোহিঙ্গারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ছিল।
১৯৮২ সালের মিয়ানমার নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গাদের দেশটির সরকারিভাবে স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর তালিকা থেকে বাদ দেয়। এর ফলে অধিকাংশ রোহিঙ্গা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে।
মিয়ানমারের সরকার ও আইনজীবীরা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে উল্লেখ করেন। এই শব্দের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়।
কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের চলাচল, বিবাহ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। ১৯৭৮ সালে এবং পরে ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালের সহিংসতায় লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
২০১২ সালে রাখাইনে সংঘর্ষের পর প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন রোহিঙ্গা। তাদের অনেকেই এখনো রাজ্যের রাজধানী সিত্তওয়ের আশপাশের বিভিন্ন শিবিরে আটকা পড়ে আছেন।
জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের শুনানিতে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী সালমা লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড (LAW)-এর মাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, “মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা কয়েক দশক ধরে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে।” নিরাপত্তার কারণে তিনি কেবল প্রথম নাম ব্যবহার করার অনুরোধ করেছেন।
অনেক শরণার্থীর কাছে ন্যায়বিচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে প্রায় ৫০০ রোহিঙ্গাকে নিয়ে (LAW)-এর চালানো জরিপে ৮৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, ন্যায়বিচারের জন্য মিয়ানমারের নাগরিকত্ব এবং রোহিঙ্গা পরিচয়ে স্বীকৃতি অপরিহার্য।
একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, “আমরা চাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ১৯৮২ সালের আইনটি বাতিল করুক। আমরা আশা করি তারা তা করবে। আমাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ছিল এবং আমরা দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস করেছি। তাই আমাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। এই দুটি বিষয় নিশ্চিত হলে আমরা সবকিছু ফিরে পাব।”
মালভি বলেন, “তারা ন্যায়বিচার চায়, কিন্তু একই সঙ্গে নাগরিকত্বও চায়। তাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার স্বীকৃতি চায়। তারা নিজেদের জমি ও সম্পত্তিও ফেরত চায়।”
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালানোর পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী উত্তর রাখাইনে তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করে।
পরবর্তী কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বর্তমানে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
২০১৮ সালে জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানকারী মিশন জানায়, গণহত্যার উদ্দেশ্য অনুমান করার মতো যথেষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। মিশনটি তৎকালীন সেনাপ্রধান ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মিন অং হ্লাইংসহ জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানায়।
মালভি বলেন, ওই প্রতিবেদনের যৌন সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত অংশগুলোর খসড়া তৈরির কাজ তিনি করেছিলেন।
তার ভাষায়, “গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা শুরু করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানকারী মিশনের প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করেছিল।”
গাম্বিয়ার তৎকালীন আইনমন্ত্রী আবু বকর তাম্বাদো বহু বছর রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সালে তিনি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো পরিদর্শন করেন।
২০১৯ সালের নভেম্বরে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থনে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলাটি দায়ের করে।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশটির সঙ্গে রাখাইনের সহিংসতার সরাসরি কোনো যোগসূত্র না থাকলেও মামলাটি ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির ওপর দাঁড়ানো। ২০২২ সালে আদালত যে নীতি গ্রহণ করে, তাতে বলা হয়- গণহত্যা সনদের প্রতিটি পক্ষরাষ্ট্রেরই এই সনদ রক্ষায় অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালত সর্বসম্মতিক্রমে মিয়ানমারকে গণহত্যা প্রতিরোধে তার ক্ষমতার মধ্যে থাকা সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।
এর এক বছর পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে।
২০২২ সালের জুলাইয়ে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে মিয়ানমারের আপত্তি বিচারকরা প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামলার মূল শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার পথ খুলে যায়।
তিন সপ্তাহের সেই শুনানিতে রুদ্ধদ্বার কক্ষে তিনজন রোহিঙ্গা সাক্ষীর জবানবন্দি শোনেন বিচারকরা। তাদের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী। আদালতের নথিতে তাদের কেবল নামের আদ্যক্ষর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনজনই গাম্বিয়ার মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা তিনটি গ্রামের একটির বাসিন্দা ছিলেন- মিন গি, মং নু এবং ছুট পিন।
তাদের আইনজীবী মালভি জানিয়েছেন, সাক্ষীরা পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড, নিজেদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতা এবং রাখাইন থেকে পালিয়ে আসার অভিজ্ঞতা আদালতের সামনে তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে দুজন কক্সবাজার থেকে হেগে গিয়েছিলেন এবং একজন কানাডা থেকে, যেখানে তাকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।
মালভি বলেন, “আদালতকক্ষে একেবারে নিস্তব্ধতা ছিল। কান্নার শব্দও শোনা যাচ্ছিল। সাক্ষ্যগুলো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। অবশ্যই রায় কী হয়, সেটি দেখতে অপেক্ষা করতে হবে। তবে এর গুরুত্ব স্পষ্টভাবে অনুভব করা যাচ্ছিল।”
(LAW) ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে আরও তিনজন রোহিঙ্গা জীবিত ব্যক্তিকে প্রতিনিধিদল হিসেবে আদালতে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে ছিলেন একজন পুরুষ, একজন নারী ও একজন হিজড়া। দক্ষিণ এশিয়ায় ট্রান্সজেন্ডার ও ইন্টারসেক্স ব্যক্তিদের পরিচয়ের ক্ষেত্রে ‘হিজড়া’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
মালভি বলেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ভুক্তভোগীদের কোনো প্রতিনিধিদলে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি থাকার এটিই প্রথম ঘটনা।
প্রতিনিধিদলের সদস্য সালমা বলেন, “আমরা জানতাম না যে আইনি ব্যবস্থা আছে এবং নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করা যায়। এখন আমাদের কাছে আত্মপক্ষ সমর্থন করার এবং আমাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার জন্য জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণ চাওয়ার একটি উপায় আছে।”
প্রতিনিধিদলের হিজড়া সদস্য রেহানা, যিনি কেবল প্রথম নাম ব্যবহার করতে চেয়েছেন, বলেন, আদালতের রায়ে পুরো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, “যদি গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, আমরা আশা করি ন্যায়বিচার পাব। হিজড়াসহ পুরো সম্প্রদায়ের জন্য ন্যায়বিচার চাই।”
মালভি জানিয়েছেন, (LAW) আরও শত শত পৃষ্ঠার লিখিত সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে দাখিল করেছে এবং গাম্বিয়া সেই নথির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছে।
গাম্বিয়ার মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ।
মিয়ানমারের সেনাদের বিষয়ে মালভি বলেন, “তারা বিশেষ করে সন্তান ধারণে সক্ষম নারী ও মেয়েদের বেছে নিত। তাদের গণধর্ষণ করা হতো। এটি ছিল ব্যবহৃত প্রধান পদ্ধতিগুলোর একটি।”
তিনি বলেন, তদন্তকারীরা এমন একটি ধারা পেয়েছেন, যেখানে ভুক্তভোগীদের শরীরে স্থায়ী চিহ্ন রাখার উদ্দেশ্যে কামড় দেওয়া হতো।
তার মতে, সম্প্রদায়ের সামনে এসব ধর্ষণ চালানো “সমাজের সামাজিক কাঠামো ধ্বংস করার অভিপ্রায়” প্রতিফলিত করে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এর আগে বসনিয়া বনাম সার্বিয়া এবং ক্রোয়েশিয়া বনাম সার্বিয়া মামলায় স্বীকার করেছে যে ধর্ষণ গণহত্যার একটি কাজ হতে পারে। তবে দুটি মামলার কোনোটিতেই এসব কাজকে গণহত্যা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ অভিপ্রায় খুঁজে পায়নি আদালত।
মালভি বলেছেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রায় হলে এটি হবে “প্রথমবার, যখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত মূল রায়ে যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।”

গণহত্যার অভিপ্রায় প্রমাণের বড় পরীক্ষা
মামলার সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারকরা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের আগের রায় এবং সাবেক যুগোস্লাভিয়া ও রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নজির বিবেচনা করবেন।
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত গণহত্যা সনদ অনুযায়ী, কোনো জাতীয়, নৃতাত্ত্বিক, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার বিশেষ উদ্দেশ্যে সংঘটিত পাঁচ ধরনের কাজের যেকোনো একটি গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
২০০৭ সালে বসনিয়া বনাম সার্বিয়া মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রায় দেয়, গণহত্যার অভিপ্রায় অবশ্যই গোষ্ঠীর অন্তত একটি ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’কে ধ্বংস করার লক্ষ্যে হতে হবে। একই সঙ্গে ধ্বংস বলতে সাংস্কৃতিক বিলুপ্তি নয়, ভৌত বা জৈবিক ধ্বংস বোঝানো হবে।
আদালত আরও জানিয়েছিল, কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণে ‘সম্পূর্ণ অকাট্য’ সাক্ষ্যপ্রমাণ প্রয়োজন।
বিশেষ পরিস্থিতি থেকে অভিপ্রায় প্রমাণ করা যেতে পারে অথবা কোনো ধারাবাহিক আচরণ থেকেও তা অনুমান করা যেতে পারে। তবে ২০১৫ সালের ক্রোয়েশিয়া বনাম সার্বিয়া মামলায় আদালত এই অনুমানের জন্য একটি খুব উচ্চ মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
আদালত বলেছিল, কোনো ধারাবাহিক আচরণ থেকে গণহত্যার অভিপ্রায় অনুমান করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডগুলো থেকে যুক্তিসঙ্গতভাবে কেবল একটিই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হতে হবে- সেটি হলো গণহত্যার উদ্দেশ্য।
এই মানদণ্ড প্রয়োগ করেই ২০০৭ সালে বসনিয়া বনাম সার্বিয়া মামলায় আদালত সিদ্ধান্ত দেয় যে গণহত্যা কেবল স্রেব্রেনিৎসায় ঘটেছিল। সার্বিয়া সেই গণহত্যা প্রতিরোধ ও অপরাধীদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দায়ী ছিল, তবে সরাসরি গণহত্যা সংঘটনের জন্য দায়ী ছিল না।
গাম্বিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্কে অংশ নেওয়া আইনজীবী ফিলিপ স্যান্ডস ও পল রাইখলার বলেছেন, উত্তর রাখাইনে মিয়ানমারের সামরিক অভিযান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে লক্ষ্য করেছিল এবং এর প্রমাণ গোষ্ঠীটিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’ লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল কি না, তা বোঝাতে স্যান্ডস মিয়ানমারেরই লিখিত নথির পরিসংখ্যান ব্যবহার করেন।
তার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের অভিযানের আগে উত্তর রাখাইনের মংডো, বুথিডং ও রাথেডং- এই তিন টাউনশিপে ৮ লাখ ১৫ হাজার ৪৫৯ জন রোহিঙ্গা বাস করত। তাদের মধ্যে প্রায় সাত লাখ, অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের প্রায় ৯ জন, বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
স্যান্ডস বলেন, সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড “হাজার হাজার বাড়িঘর এবং ৮ লাখের বেশি মানুষকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল।”
মিয়ানমার যুক্তি দিয়েছিল, আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার নিহত ব্যক্তি গোষ্ঠীটির ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’ নয়।
স্যান্ডস বলেন, এই সংখ্যা “সম্ভবত প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম।”
তার অভিযোগ, “মিয়ানমার প্রমাণ ধ্বংসের সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে গণকবরে বিপুলসংখ্যক মৃতদেহ পুঁতে ফেলার প্রমাণও রয়েছে।”
স্যান্ডস বলেন, “গণহত্যা কোনো সংখ্যার খেলা নয়। এমন কোনো জাদুকরী সংখ্যা নেই, যেটি পার হলেই একটি অপরাধ অন্য ধরনের অপরাধে রূপ নেয়।”
তিনি আরও বলেন, “প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সাত লাখ মানুষ তাদের নিহত ভাইবোনদের তুলনায় কোনো অংশেই কম লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না।”
উত্তর রাখাইনের গুরুত্বও তুলে ধরেন স্যান্ডস। তার মতে, এটি ছিল মিয়ানমারের একমাত্র অঞ্চল, যেখানে রোহিঙ্গারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল।
গণহত্যার অভিপ্রায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ এবং ধারাবাহিক আচরণ- দুটির মাধ্যমেই তা প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি প্রথমে তিন সাক্ষীর গ্রামের উদাহরণ দেন।
আদালতে স্যান্ডস বলেন, “এমন কোনো পরিস্থিতি হতে পারে না, যেখানে সাক্ষী এমএস-এর মেয়েকে নদী পার হয়ে পালানোর সময় গুলি করে হত্যা করা গণহত্যা ছিল না অথবা একটি বাড়িতে তার স্ত্রী ও অন্য চার সন্তানকে ইচ্ছাকৃতভাবে পুড়িয়ে হত্যা করাও গণহত্যা ছিল না।”
তিনি আরও বলেন, এমন পরিস্থিতিও হতে পারে না যেখানে সাক্ষী এনজেকে গণধর্ষণ করা এবং তার চোখের সামনে শিশুসন্তানকে হত্যা করা গণহত্যার অংশ ছিল না।
স্যান্ডস যুক্তি দেন, মিয়ানমার গণহত্যার উদ্দেশ্যেই কাজ করেছে। কারণ দেশটির “বৈষম্যমূলক নীতি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, পূর্বপরিকল্পনা ও সংগঠন, চরম নৃশংসতা, যৌন সহিংসতা, শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা, প্রমাণ ধ্বংস, অপরাধীদের দায়মুক্তি এবং জাতিসংঘের সঙ্গে সহযোগিতা না করা- এসবকে অন্য কোনোভাবে যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।”
পল রাইখলার আদালতের বহুল আলোচিত ‘একমাত্র যুক্তিসঙ্গত অনুমান’ পরীক্ষার প্রসঙ্গ তোলেন।
এই পরীক্ষায় প্রশ্ন হলো, রাখাইনে সংঘটিত ঘটনাগুলোর জন্য গণহত্যা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাখ্যা যুক্তিসঙ্গতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না।
মিয়ানমারের জবাব ছিল, অভিযানটি ছিল সন্ত্রাসবাদবিরোধী।
রাইখলার বলেন, “তারা পুরোপুরি সন্ত্রাসবাদ দমন যুক্তির ওপর নির্ভর করেছে।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের প্রধান আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টেকারও স্বীকার করেছেন যে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের মধ্যেও গণহত্যা সংঘটিত হতে পারে।
রাইখলার যুক্তি দেন, মিয়ানমার আরসার হামলার জবাবে সামরিক অভিযান শুরু করলেও “সেখানে একটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চলছিল- এটি কেবল পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি। এটি নিজে উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে না।”
তার মতে, মূল প্রশ্ন হলো, “রাষ্ট্রের অনুমোদিত প্রতিনিধিরা যখন নারী ও শিশুসহ রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি চালানো শুরু করেছিল, তখন রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কী ছিল?”
এরপর তিনি দ্বিতীয় সম্ভাব্য ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করেন- মিয়ানমার হয়তো রোহিঙ্গাদের ধ্বংস নয়, কেবল দেশছাড়া করতে চেয়েছিল। ২০১৫ সালে সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মামলায় আদালত একই ধরনের বিষয় বিবেচনা করেছিল।
রাইখলার গাম্বিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞের সাক্ষ্যের উল্লেখ করেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মিয়ানমারের অভিযান গণহত্যা না হয়ে কেবল জাতিগত নির্মূল অভিযান হতে পারে কি না।
বিশেষজ্ঞ বলেন, তা হতে পারে না। কারণ কোনো গোষ্ঠীকে শুধু অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করার অভিযানে সাধারণত সেই গোষ্ঠীর শিশুদের হত্যা করা হয় না।
তিনি আরও বলেন, কেবল বিতাড়নই উদ্দেশ্য হলে পালিয়ে যাওয়া মানুষের ওপর লাগাতার গুলি চালানো কিংবা বাংলাদেশে পৌঁছানোর মুহূর্তে নৌকা ডুবিয়ে দিতে নদীতে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হতো না।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরও সীমান্ত চৌকিগুলোতে ল্যান্ডমাইন বসানো হয়েছিল।
জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানকারী মিশনের মতে, এসব মাইন “পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করার পাশাপাশি ইতোমধ্যে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের ফিরে আসা ঠেকাতে” বসানো হয়েছিল।
রাইখলার রাখাইনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জর্জিয়া বনাম রাশিয়া মামলার তুলনা করেন, যেখানে তিনি জর্জিয়ার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন।
সেই মামলায় রুশ বাহিনী জাতিগত জর্জিয়ানদের দক্ষিণ ওসেটিয়া ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল। যারা চলে গিয়েছিল, তাদের কোনো ক্ষতি করা হয়নি। পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের ওপর গুলি চালানো হয়নি এবং কোনো পরিকল্পিত যৌন সহিংসতার অভিযোগও ছিল না।
রাইখলার বলেন, “এই তথ্যগুলো প্রমাণিত হলে সেটি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বা জাতিগত নির্মূল হতে পারে। কিন্তু গণহত্যা নয়।”
তার মতে, সাবেক যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাতমাদাও “মিয়ানমারের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের চেষ্টা করছিল না।”
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, গাম্বিয়ার যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর এবং তাদের আর জবাব দেওয়ার সুযোগ না থাকলে মিয়ানমার হয়তো দ্বিতীয় দফার শুনানিতে নিজের ব্যাখ্যা পরিবর্তন করতে পারে।
মালভি বলেছেন, ঠিক সেটিই ঘটেছিল।
তার ভাষায়, মিয়ানমার “মৌখিক শুনানির একেবারে শেষ পর্যায় পর্যন্ত নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তরকে তাদের মূল যুক্তি হিসেবে সামনে আনেনি।”
২৯ জানুয়ারি মিয়ানমারের চূড়ান্ত শুনানিতে আইনজীবী স্টেফান টালমন গাম্বিয়ার নিজস্ব একজন সাক্ষী এমএনের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন।
ওই সাক্ষী আদালতকে বলেছিলেন, “আমরা জানতাম, সেনাবাহিনী আমাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্যই এটি করেছে।”
টালমন যুক্তি দেন, এই বক্তব্য থেকে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে যে সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য রোহিঙ্গাদের জাতি হিসেবে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা নয়, বরং দেশ থেকে বিতাড়ন করা ছিল।
তিনি বলেন, “সুতরাং এই আচরণ থেকে যুক্তিসঙ্গতভাবে অন্তত আরও একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।”
তবে রাইখলার পাল্টা যুক্তিতে বলেন, বিতাড়ন উদ্দেশ্য হলেও আদালতের নিজের পূর্ববর্তী রায় অনুযায়ী গণহত্যা সংঘটিত হতে পারে, যদি স্থানচ্যুতির লক্ষ্য শুধু অঞ্চল থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়, গোষ্ঠীটিকে ধ্বংস করা হয়।
তিনি আরও বলেন, আরসার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মতো অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকা গণহত্যার অভিপ্রায়কে বাতিল করে না।
তিনি স্রেব্রেনিৎসা মামলার উদাহরণ দেন, যেখানে বসনীয় সার্ব নেতৃত্বের বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল একটি বড় সার্ব রাষ্ট্র গঠন করা। এরপরও নির্দিষ্ট মুহূর্তে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞকে আদালত গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
রাইখলারের মতে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেই মুহূর্তের উদ্দেশ্য, যখন মিয়ানমারের সেনারা “পুরুষ ও ছেলেদের আলাদা করে হত্যা করছিল, নারী ও মেয়েদের ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণ করছিল এবং শিশু ও নবজাতকদের হত্যা করে আগুনে নিক্ষেপ করছিল।”
তিনি বলেন, ২০১৮ সাল পর্যন্তও ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে। ১৮০টির বেশি এমন গ্রামও ধ্বংস করা হয়, যেখানে মিয়ানমার নিজেই স্বীকার করেছে আরসার কোনো কার্যক্রম ছিল না।
এরপর অনেক স্থানে বুলডোজার চালানো হয়, রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে পুনর্বাসিত করা হয় এবং সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়।
মালভিও নিজের তদন্তে একই ধরনের ধারা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “তারা প্রথমে গ্রাম ঘিরে ফেলত। প্রায়ই ভোরে, যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকত, তখন মর্টার হামলা চালানো হতো। এরপর নির্বিচারে বেসামরিক মানুষের ওপর গুলি চালানো হতো।”
তার মতে, বাংলাদেশের দিকে পালাতে থাকা মানুষের ওপরও সেনারা গুলি চালাত।
তিনি বলেন, “তারা যেন পথেই নিহত হয়, তা নিশ্চিত করাই ছিল তাদের কাজ।”
মিয়ানমার সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির দাবি, আরসার হামলার জবাবে এই অভিযান ছিল একটি আইনসম্মত সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ।
২০২৩ সালের নভেম্বরে কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য গাম্বিয়ার সমর্থনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যৌথ আবেদন দাখিল করে।
তারা মামলায় হস্তক্ষেপকারী মোট ১১টি রাষ্ট্রের মধ্যে ছিল।
এ ধরনের হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রগুলো ঘটনার সত্যতা নিয়ে সরাসরি অবস্থান নেয় না। বরং গণহত্যা সনদের ব্যাখ্যা কীভাবে হওয়া উচিত, সেই বিষয়ে আদালতকে মতামত দেয়।
এই ছয় দেশ সতর্ক করে বলেছিল, ‘একমাত্র যুক্তিসঙ্গত অনুমান’ পরীক্ষাটি এত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয় যে গণহত্যা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ কোনো রাষ্ট্রই সাধারণত কোনো জনগোষ্ঠী ধ্বংসের পরিকল্পনা লিখিতভাবে ঘোষণা করে না।
তারা আরও যুক্তি দেয়, নিহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে কোনো গণহত্যা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা উচিত নয়।
তাদের মতে, ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার কোনো সাধারণ সামরিক উদ্দেশ্য নেই। ফলে এসব কর্মকাণ্ড একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যের শক্তিশালী ইঙ্গিত হতে পারে।
ছয় রাষ্ট্র আরও বলেছে, জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানকারী মিশনের প্রতিবেদন স্বাধীন তদন্তকারীদের কাজ হওয়ায় বিশেষ প্রমাণমূলক গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য।
স্যান্ডস ও রাইখলার উভয়েই তাদের সমাপনী বক্তব্যে এই যৌথ আবেদনের বিভিন্ন অংশ উদ্ধৃত করেন।

রায় বদলে দিতে পারে গাজা মামলার পথও
ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের অধ্যাপক মাইকেল বেকার বলেছেন, এই প্রথম আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এমন একটি মামলায় ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে মূল রায় দিতে যাচ্ছে, যেখানে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার স্বার্থে মামলা করেছে।
তিনি বলেন, “গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমারের মতো মামলাগুলো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ভূমিকা ও সমসাময়িক ঘটনাবলিতে এর কার্যকারিতা বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই মামলার ফলাফলই দেখাবে, সেই ধারা এগিয়ে যাবে কি না।”
বেকারের মতে, রায়টি বিশেষ করে প্রমাণ থেকে গণহত্যার অভিপ্রায় কীভাবে অনুমান করা হবে, সে বিষয়ে আইনের ব্যাখ্যাকে আরও স্পষ্ট করতে পারে।
তিনি বলেন, “মিয়ানমারের যুক্তির মূল কথা হলো, যেসব পদক্ষেপকে যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বলা যায়, সেগুলোকে একই সঙ্গে গণহত্যা হিসেবে গণ্য করা যায় না।”
তার মতে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যদি এই যুক্তি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা ইসরায়েলবিরোধী মামলায়।
সেখানে ইসরায়েলও যুক্তি দিয়েছে, হামাসের সঙ্গে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের বাস্তবতা থেকে একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে গাজার ফিলিস্তিনিদের ভৌত ধ্বংসের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রটি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
বেকার বলেন, সম্প্রতি কেউ কেউ যে দাবি করছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত গণহত্যার অভিপ্রায় প্রমাণের ‘মানদণ্ড শিথিল’ করতে পারে, তা বিভ্রান্তিকর।
তার মতে, এই ধরনের বক্তব্য আদালতের পূর্ববর্তী রায়গুলোর মধ্যেই যে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে, তা যথেষ্টভাবে বিবেচনায় নেয় না।
রায়টি জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনের প্রমাণমূলক মূল্য সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
মিয়ানমার তাদের প্রতিরক্ষার বড় অংশে জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানকারী মিশনের প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে গাম্বিয়া একই প্রতিবেদনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছে।
বেকার বলেন, “আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যদি এই ধরনের প্রতিবেদনের ফলাফল গ্রহণে অনীহা দেখায়, তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভবিষ্যতের অন্যান্য মামলার পক্ষগুলোর জন্য এটি একটি স্পষ্ট বার্তা হবে যে তাদের দাবির সমর্থনে অন্য ধরনের প্রমাণ খুঁজতে হবে।”
গত বছর জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্তে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছিল যে গাজায় গণহত্যার জন্য ইসরায়েল দায়ী।
ওই তদন্তের প্রধান নাভি পিল্লাই সে সময় বলেছিলেন, তাদের প্রতিবেদনে গণহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ব্যবহৃত একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে। তার মতে, প্রতিবেদনের ফলাফল আদালতের কাছে “বিশেষ প্রমাণমূলক মূল্য” বহন করবে।
ইসরায়েল চলতি বছরের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলার জবাব দাখিল করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পাল্টা জবাব ২০২৭ সালের নভেম্বরে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে রোহিঙ্গাদের কাছে আদালতের রায়ের অর্থ আরও তাৎক্ষণিক ও ব্যক্তিগত।
মালভি বলেন, তাকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করা হয়, এই রায়ের ফলে কক্সবাজারের সেইসব মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে, “যাদের দৈনিক আয় এক ডলারেরও কম।”
তিনি বলেন, “সংক্ষেপে বললে, হ্যাঁ- এটি তাদের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে। তাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালত সেটিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে- এই বিষয়টি তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
(LAW)-এর গবেষকদের সঙ্গে কথা বলা বহু শরণার্থী জানিয়েছেন, শুধু ক্ষতিপূরণ ও অপরাধীদের শাস্তিই তাদের কাছে যথেষ্ট নয়।
একজন জরিপ অংশগ্রহণকারী বলেন, “আমাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার মূল কারণ কী? সেই মূল কারণটি সমাধান করতে হবে। আমরা যদি শুধু ক্ষতিপূরণ, তাদের শাস্তি বা এ ধরনের বিষয় চাই, তাহলে আমার মনে হয় না আমরা প্রকৃত ন্যায়বিচার পাব।”
এক নারী অংশগ্রহণকারী বলেন, “আমাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য ন্যায়বিচারের অর্থ নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তারা শিক্ষা পাবে এবং মিয়ানমারে সফল হতে পারবে।”
গাম্বিয়ার চূড়ান্ত আবেদনেও এই দাবিগুলোর কয়েকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
তারা আদালতের কাছে আবেদন করেছে, মিয়ানমারকে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হোক।
এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন, সম্পত্তি পুনরুদ্ধার, রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অধিকার এবং “পূর্ণ ও সমান নাগরিকত্ব” নিশ্চিত করা।
লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড (LAW) রোহিঙ্গাদের জন্য একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যা আদালতের নির্দেশে দেওয়া যেকোনো ক্ষতিপূরণের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
শৈশবে রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা তরুণ রোহিঙ্গা সামির সাদাফ LAW-এর প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে আদালতের রায়ের বাইরেও ন্যায়বিচারের অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি লিখেছেন, “আমার কাছে ন্যায়বিচার মানে সত্য। এর অর্থ অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যেখানে ন্যায়বিচার থাকবে, সেখানে নিরাপত্তা, সমান অধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা এবং মর্যাদাও থাকতে হবে।”
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় বাধ্যতামূলক এবং এর বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই। তবে আদালতের নিজস্ব কোনো বলপ্রয়োগকারী ব্যবস্থা নেই।
কোনো রাষ্ট্র রায় মানতে অস্বীকার করলে বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যেতে পারে। সেখানে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ঘনিষ্ঠ অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।
২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া মিন অং হ্লাইং বিতর্কিত নির্বাচনের পর এপ্রিলে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন।
বেকার বলেন, “মিয়ানমারে সামরিক শাসন চলাকালে এমন একটি রায় পুরোপুরি কার্যকর করা অসম্ভব হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে পুনরায় গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার শর্ত হিসেবে আইসিজের রায় মানা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।”
তার মতে, মিয়ানমার গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করেছে- এমন রায় হলে তৃতীয় দেশগুলোর ওপরও মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার চাপ বাড়তে পারে, যতক্ষণ না দেশটি প্রকৃত সংস্কারের প্রমাণ দেখায়।
মালভি জানিয়েছেন, রায় ঘোষণার সময় (LAW)-এর ভুক্তভোগী প্রতিনিধিদল আদালতকক্ষে উপস্থিত থাকবে।
জানুয়ারির শুনানিতে আদালতে উপস্থিত থাকা সালমা বলেছেন, রোহিঙ্গারা তাদের দাবি থেকে সরে যাবে না।
তার ভাষায়, “ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা ফিরে যাব না।”
- সন্ডোস আসেম: লন্ডনের মিডল ইস্ট আই-এর একজন সাংবাদিক এবং নিউজ এডিটর, যেখানে তিনি আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতি নিয়ে কাজ করেন।

