যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ বছরের কম বয়সী প্রতিটি শিশুকে আগামী বছর থেকে নিজের মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের একটি করে শেয়ার দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ইলন মাস্ক। তাঁর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে উপহারের মোট মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৭০ কোটি ডলার। তবে কীভাবে শেয়ার বিতরণ করা হবে, কারা এই সুবিধা পাবে এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা কী—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাস্ক লেখেন, ‘আগামী বছর আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুকে স্পেসএক্সের একটি করে শেয়ার দেব। এটি হবে এমন অনেক উদ্যোগের প্রথমটি।’
যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১৮ বছরের কম বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ। স্পেসএক্সের প্রতিটি শেয়ারের দাম প্রায় ১৪৬ ডলার হিসাবে এই উদ্যোগের সম্ভাব্য মোট মূল্য প্রায় ১ হাজার ৭০ কোটি ডলার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনে ইতিহাসের বৃহত্তম প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারবাজারে প্রবেশ করে স্পেসএক্স। তবে শিশুদের মধ্যে শেয়ার বিতরণের প্রস্তাবের বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া, যোগ্যতার শর্ত কিংবা সম্ভাব্য সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক তাদের অন্তত ৫ শতাংশ শেয়ার একটি ‘জনকল্যাণ তহবিলে’ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর মাস্কের এই প্রস্তাব সামনে আসে। প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ বেসরকারি মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওই শেয়ারগুলোর মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তহবিল থেকে অলাভজনক সংস্থাগুলোকে বড় অঙ্কের অনুদান দেওয়া হতে পারে। নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সরাসরি অর্থ বিতরণের সম্ভাবনাও রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থানের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কমাতেও এই অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় মাস্ক বলেন, তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে সরাসরি শেয়ার বিতরণের পক্ষে এবং নিজেও তা করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নতুন নয়। চলতি মাসে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় ১৮ বছরের কম বয়সী লাখ লাখ শিশুকে ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’ নামের একটি সরকারি সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কর্মসূচিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত জন্ম নেওয়া শিশুরা এ কর্মসূচির আওতায় এককালীন ১ হাজার ডলার সরকারি অনুদান পাওয়ার যোগ্য।
গত জুলাইয়ে স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট গুইন শটওয়েল ও তাঁর স্বামী প্রতিশ্রুতি দেন, ইতিমধ্যে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এমন প্রায় ২০ লাখ শিশুকে তাঁরা স্পেসএক্সের একটি করে শেয়ার দেবেন। এ ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু এবং স্পেসএক্সের নিজস্ব অঙ্গরাজ্য টেক্সাসের শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান তাঁরা।
২০১২ সালে বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের দাতব্য অঙ্গীকার ‘গিভিং প্লেজ’-এ স্বাক্ষর করেন মাস্ক। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, স্বাক্ষরকারীরা জীবদ্দশায় অথবা মৃত্যুর পর নিজেদের সম্পদের বড় অংশ দাতব্য কাজে দান করবেন।
মাস্ক ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মহাকাশ অনুসন্ধান এবং শিশুদের চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণাসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে অনুদান দেয় সংস্থাটি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ মাস্ক ফাউন্ডেশনের সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি। তবে ওই পত্রিকার প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ফাউন্ডেশনটির অনুদানের বড় অংশ এমন প্রতিষ্ঠানগুলোতে গেছে, যেগুলোর সঙ্গে মাস্কের ব্যবসায়িক স্বার্থের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে স্পেসএক্স তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।
প্রচলিত দাতব্য কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মাস্ক। গত বছর ‘পিপল বাই ডব্লিউটিএফ’ পডকাস্টে তিনি বলেন, মানুষের প্রকৃত উপকারে আসে এমনভাবে অর্থ ব্যয় করাই দাতব্য সংস্থার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২১ সালে মাস্ক বলেছিলেন, টেসলার ৬০০ কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রি করে সেই অর্থ জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে দান করবেন। তবে সংস্থাটিকে ওই অর্থ দিয়ে কীভাবে বিশ্বের ক্ষুধার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব, তা দেখাতে হবে বলে শর্ত দিয়েছিলেন তিনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ওই পরিমাণ অর্থ দান করেছেন বলে মনে হয় না।
মাস্ক ও অ্যানথ্রপিকের উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং প্রযুক্তি খাতের পরিবেশগত দায় নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বিপুলসংখ্যক মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বড় আকারের তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক ও সামাজিক দায়িত্ব নিয়েও নতুন করে আলোচনা চলছে। এ প্রেক্ষাপটে শিশুদের মধ্যে স্পেসএক্সের শেয়ার বিতরণের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা সাধারণ মানুষের সম্পদে অংশীদারত্ব দেওয়ার একটি বড় উদ্যোগ হতে পারে। তবে পরিকল্পনাটির বিস্তারিত প্রকাশ এবং বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত এর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।

