ভারতের শেয়ারবাজারে মন্দা চললেও দেশটির দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানি সর্বকালের বৃহত্তম ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) চালু করতে যাচ্ছেন। স্বল্পমূল্যের ব্রডব্যান্ড পরিষেবা প্রদানকারী জিও প্ল্যাটফর্মস বুধবার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় ৮১ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
মেটা প্ল্যাটফর্মস ও গুগলের সমর্থনপুষ্ট মুম্বাইভিত্তিক টেলিকম প্রতিষ্ঠান জিও প্ল্যাটফর্মস আইপিওর মাধ্যমে ৩০২ বিলিয়ন রুপি বা ২.৪ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত তহবিল সংগ্রহের আশা করছে। বুধবার থেকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর কোম্পানিটির মূল্যায়ন ১০.৩ ট্রিলিয়ন রুপিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এক দশক আগে মুকেশ আম্বানির বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জিও প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে রয়েছেন আম্বানির জ্যেষ্ঠ পুত্র আকাশ আম্বানি। ভারতের লাখ লাখ গ্রাহককে সাশ্রয়ী মূল্যে ব্রডব্যান্ড ও টেলিযোগাযোগ পরিষেবা দিয়ে আসছে কোম্পানিটি।
বড় পরিসরের এই আইপিওর আগে সোমবার জিও ২১২ জন অ্যাঙ্কর বিনিয়োগকারী নিশ্চিত করেছে। তাঁদের মধ্যে বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ তহবিল ব্যবস্থাপক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী রয়েছে। তালিকায় রয়েছে ব্ল্যাকরক, সিঙ্গাপুরের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল, আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি, ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টস, শ্রোডার্স, জেপি মরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, ফ্র্যাঙ্কলিন টেম্পলটন, ইনভেসকো এবং প্রুডেনশিয়াল।
বুধবার খুচরা বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার বিক্রি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। শুক্রবার আইপিওর আবেদন গ্রহণ শেষ হওয়ার কথা।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ গত সপ্তাহে স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া এক নথিতে জানিয়েছে, জিও প্রথমবারের মতো শেয়ার বিক্রির জন্য প্রতি শেয়ারের মূল্যসীমা ১ হাজার ৬৫ থেকে ১ হাজার ১১৯ রুপি নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া সর্বোচ্চ ২৭ কোটি নতুন শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
পারিবারিক মালিকানাধীন এই শিল্পগোষ্ঠী তার চার লাখের বেশি কর্মচারীকে শেয়ারপ্রতি ৫৪ রুপি ছাড়ে শেয়ার কেনার সুযোগ দিচ্ছে।
মূল্যসীমার সর্বোচ্চ পর্যায় অনুযায়ী, জিওর বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে ১০.৩ ট্রিলিয়ন রুপি। এই মূল্যায়ন বাস্তবায়িত হলে ভারতের বৃহত্তম কোম্পানিগুলোর মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে উঠে আসবে প্রতিষ্ঠানটি। এর ওপরে থাকবে মূল কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ভারতী এয়ারটেল এবং এইচডিএফসি ব্যাংক।
এই মূল্যায়ন ২০২০ সালে জিওর ৪.৯ ট্রিলিয়ন রুপির মূল্যায়নের দ্বিগুণেরও বেশি। ওই বছর মেটা ও গুগল কোম্পানিটিতে বিনিয়োগ করেছিল।
তবে গ্রীষ্মকালে জিও যখন আইপিওর প্রাথমিক প্রসপেক্টাস প্রকাশ করেছিল, তখন কোম্পানিটির সম্ভাব্য মূল্য ১১০ বিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। বর্তমান মূল্যায়নের লক্ষ্য সেই প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।
ভারতের শেয়ারবাজারে সামগ্রিক দরপতনের মধ্যেই জিওর এই আইপিও আসছে। চলতি বছর দেশটির প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ব্লু-চিপ নিফটি ৫০-এর দর ১২ শতাংশের বেশি কমেছে।
জিও ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে টেলিযোগাযোগ পরিষেবা চালু করে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম মাসেই প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ৬০ লাখ গ্রাহক পেয়েছিল। মাত্র ১৭০ দিনের মধ্যে গ্রাহকসংখ্যা ১০ কোটির মাইলফলক অতিক্রম করে।
ভারতে মোবাইল ইন্টারনেটের দাম কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে জিওর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি বাজারে প্রবেশের পর তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যার ফলে মোবাইল ইন্টারনেট আরও সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে।
এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো খাতেও ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে জিও।
কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ইশা আম্বানি গত সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের জানান, প্রায় ২০০৯-১০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার বিরতিতে ভারতে ফেরার পর তিনি ও তাঁর ভাই আকাশ দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জিওর ব্যবসায়িক ধারণার জন্ম হয়।
ইন্টারনেট সংযোগ ঠিকমতো কাজ না করায় তিনি অনলাইনে কলেজের একটি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে সমস্যায় পড়েছিলেন বলে জানান ইশা।
তিনি বলেন, “এরপর আলোচনা হয়েছিল, ভারত কেন পিছিয়ে থাকবে? আকাশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, এর উত্তর ও সমাধান হলো একটি ডিজিটাল প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম কোম্পানি তৈরি করা।”

