ইলন মাস্কের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধে সেনাদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং ড্রোন পরিচালনায় এই সেবা বড় ভূমিকা রাখছে। স্টারলিংকের মাধ্যমে ইউক্রেনের ড্রোনগুলো প্রচলিত রেডিও নেটওয়ার্কের তুলনায় অনেক দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে এসব ড্রোনের যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করাও তুলনামূলক কঠিন। সূত্র: বিবিসি
তবে গত মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ করেই স্টারলিংক ইন্টারনেট ব্যবহার করে ওড়া দ্রুতগতির ড্রোনের ওপর সীমা আরোপ করা হয়। ইউক্রেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে বেশ কিছু অভিযান ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘণ্টায় ১০০ মাইল বা ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা ড্রোনগুলোর স্টারলিংক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। ফলে সেগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
ন্যাটোর সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত কার্ট ভলকার বিবিসিকে বলেন, “স্টারলিংক ইউক্রেনকে যেকোনো হামলা প্রতিহত করতে এবং মানুষের জীবন রক্ষা করতে সহায়তা করে। এই সেবা বন্ধ করে দিলে আরও বেশি মানুষ মারা যাবে। আর এভাবে ড্রোনের গতিসীমা বেঁধে দেওয়াটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত।”
তবে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই ইন্টারনেট সংযোগ আবার সচল হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেন যুদ্ধে স্টারলিংক কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাটি তা আবারও সামনে এনেছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও সাম্প্রতিক এই বিধিনিষেধকে প্রযুক্তিগত ত্রুটির বদলে পরিকল্পিত পদক্ষেপ বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড কী
স্টারলিংক হলো নিম্ন ভূ-কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সরবরাহের একটি ব্যবস্থা। দুর্গম এলাকা থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্র—যেখানে প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন, সেখানেও এটি ইন্টারনেট সংযোগ দিতে পারে। বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি সক্রিয় স্যাটেলাইট নিয়ে এটি বিশ্বের বৃহত্তম স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। স্পেসএক্সের মালিকানাধীন এই সেবা প্রতিষ্ঠানটির আয়েরও অন্যতম প্রধান উৎস।
স্টারলিংক মূলত বেসামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি হলেও এর সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ড তৈরি করা হয়েছে পেন্টাগনের জন্য। এটিও স্টারলিংক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল, তবে এতে উন্নত এনক্রিপশনসহ বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে সংবেদনশীল সামরিক তথ্য আরও নিরাপদে আদান-প্রদান করা যায়।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে মাস্ক রাশিয়ার জন্য এই সেবার প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেন। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে যেভাবে কাজে লাগে স্টারলিংক
স্টারলিংকের হাজার হাজার স্যাটেলাইট পৃথিবীর বিস্তীর্ণ এলাকায় উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করে। ব্যবহারকারীদের শুধু একটি গ্রাউন্ড টার্মিনাল বা সংযোগযন্ত্র স্থাপন করতে হয়। মাস্কের ভাষায়, “আকাশের দিকে তাক করুন, প্লাগ ইন করুন।” সহজে স্থাপন ও ব্যবহার করা যায় বলেই যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে কার্যকর।
ইউক্রেনের একটি ড্রোন রিকনেসান্স ইউনিটের সেনাসদস্য ‘নিও’ বিবিসিকে বলেন, “এটি এমন একটি সংযোগ, যা খুব দ্রুত ব্যবহার করা যায়। বিশেষ কোনো সরঞ্জাম বা প্রস্তুতিরও প্রয়োজন হয় না। আপনি শুধু মাঠে যান, আর সাধারণত এটি কাজ করে।”
তিনি আরও বলেন, “এটি আমাদের কাজ সহজ করে দেয়। আমরা সরাসরি আমাদের নজরদারি অভিযান সম্প্রচার করতে পারি।”
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) জর্জ ব্যারোসের ভাষায়, স্টারলিংক এখন “ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগের মেরুদণ্ড”। দেশটির নৌ, স্থল ও বিমানবাহিনী—সব ক্ষেত্রেই এই নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হচ্ছে।
ড্রোনের মতো অস্ত্র পরিচালনায় স্টারলিংকের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ড্রোন অপারেটররা সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান দেখতে পারেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে লক্ষ্য শনাক্ত করা থেকে আঘাত হানা পর্যন্ত সময় কমানো সম্ভব হয়। সামরিক পরিভাষায় একে ‘সেন্সর-টু-শুটার’ সময় কমানো বলা হয়।
তবে রাশিয়াকে স্টারলিংক ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় ইউক্রেনের সব ধরনের সামরিক অভিযানে এই নেটওয়ার্ক কাজে লাগে না। যেমন রাশিয়ার গভীরে তেল শোধনাগারে হামলার জন্য ইউক্রেন যখন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তখন এসব অভিযানে স্টারলিংক কার্যকর থাকে না।
অন্যদিকে, রাশিয়ার হামলা ঠেকাতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে জেট ইঞ্জিনচালিত শাহেদ ড্রোন মোকাবিলায় এই নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে কিয়েভ। এসব ড্রোন ঘণ্টায় ১৯০ মাইলের বেশি বা প্রায় ৩১৯ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে। ফলে স্টারলিংকের মাধ্যমে সংযোগ বজায় রেখে এগুলোর পিছু নেওয়া ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু স্টারলিংকের গতিসীমা ঘণ্টায় ১০০ মাইলে বেঁধে দেওয়ায় দ্রুতগতির ড্রোনগুলোর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। এতে সেগুলোকে অনুসরণ ও প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, স্টারলিংকের এই সীমাবদ্ধতা তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে।
ইউক্রেনের সেনাসদস্য নিও এই ঘটনাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। স্টারলিংকের কার্যকর কোনো বিকল্প না থাকায় এই নেটওয়ার্কে সামান্য বিঘ্নও ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, দেশটির সামরিক কার্যক্রম কতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এই সেবার ওপর।
বিশ্বের বিস্তীর্ণ এলাকায় স্টারলিংক ইন্টারনেট সরবরাহ করতে পারলেও সব দেশে এটি ব্যবহারের অনুমতি নেই। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রয়োজন। রাশিয়ায় স্টারলিংক অনুমোদিত নয়। তবে ইউক্রেন অতীতে অভিযোগ করেছে, রাশিয়া বিভিন্ন উপায়ে টার্মিনাল সংগ্রহ করে দখলকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে সেগুলো ব্যবহার করছে।
২০২৪ সালে স্টারলিংক জানিয়েছিল, কোনো নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত বা অননুমোদিত পক্ষ তাদের টার্মিনাল ব্যবহার করছে বলে জানতে পারলে তারা তদন্ত করবে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট টার্মিনাল নিষ্ক্রিয়ও করা হবে। কিন্তু শুধু ইউক্রেনেই হাজার হাজার টার্মিনাল থাকায় কোনটি অনুমোদিত আর কোনটি নয়, তা শনাক্ত করা বেশ কঠিন।
কেন ড্রোনের গতিসীমা বেঁধে দিল স্টারলিংক
স্টারলিংক কেন হঠাৎ ড্রোনের গতিসীমা নির্ধারণ করল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। বুধবার লন্ডন সফরের সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, তিনি আশা করছেন বিষয়টি নিছক ভুল বোঝাবুঝি। পরে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এটি কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা ছিল না, বরং নির্দিষ্ট কারও ইচ্ছার প্রতিফলন।” ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসও জানিয়েছে, ইউক্রেনীয় পরীক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের এলাকায় ১৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতেও স্টারলিংক কাজ করলেও ইউক্রেনের ভেতরে প্রায় ১৬০ কিলোমিটারের ওপরে সংযোগ ব্যর্থ হচ্ছিল।
এদিকে স্টারশিল্ডের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই বলে দাবি করেছেন ইলন মাস্ক। তাঁর ভাষ্য, এই ব্যবস্থা মার্কিন সরকারের মালিকানাধীন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মাস্ক লেখেন, “স্টারশিল্ড সিস্টেমের মালিক ও নিয়ন্ত্রক মার্কিন সরকার। এর গতি বা ব্যবহারসংক্রান্ত যেকোনো সীমা নির্ধারণ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট।”
স্টারলিংক সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি স্পেসএক্সের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত একটি বাণিজ্যিক সেবা। তাঁর দাবি, স্টারলিংক কেবল বেসামরিক ও প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য। আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে এই সেবা ব্যবহার করা একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুপযুক্ত।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।
স্টারলিংকের ওপর এই বিধিনিষেধ এমন এক সময়ে আরোপ করা হয়, যখন রাশিয়া ইউক্রেনে বড় ধরনের হামলা চালায়। ওই হামলায় ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত যোগাযোগ ও জ্বালানি অবকাঠামোও। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ড্রোন হামলার আগে তাঁরা কোনো সতর্কবার্তা পাননি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা সের্হি বেসক্রেস্তনভ বুধবার সকালে টেলিগ্রামে লেখেন, “এটা স্পষ্ট যে এই পদক্ষেপ কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্কে টানাপোড়েন
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়েছে। চুক্তিটির আওতায় মার্কিন বাজারে রাশিয়ার ডিজেল আমদানির বিষয়টি উঠে এসেছে।
জেলেনস্কি এই চুক্তিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য উপহার বলে অভিহিত করেছেন। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, “ইউক্রেনের এখন একজন নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় এসেছে।”
গত রোববার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। কিন্তু তিন দিন পর ইউক্রেন জানায়, তারা আবার হামলা শুরু করবে। কিয়েভের অভিযোগ, রাশিয়া চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রত্যাহার করে নেয়।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রাখলে ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ট্রাম্প অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জেলেনস্কির হামলাগুলো “বন্ধ করাই ভালো হবে।”
এদিকে লন্ডন সফরের সময় জেলেনস্কি স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে তিনি প্রতারিত বোধ করছেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কের এই টানাপোড়েন এবং স্টারলিংক ও গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে ইউক্রেনের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনার মধ্যে আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ লক্ষ্যেই রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিটি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ওই সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যা মার্কিন জনগণের কাছে ট্রাম্পের ভাবমূর্তির ওপরও চাপ তৈরি করেছে।

