নিউইয়র্ক টাইমস
ফ্রান্সজুড়ে গত সপ্তাহে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমর্থনে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। তাঁদের অনেকের হাতে থাকা কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ডে দেখা গেছে অদ্ভুত এক স্লোগান—‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’।
মুসলিমদের পরিচিত ধর্মীয় বাক্য ‘বিসমিল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর নামে শুরু’ এবং ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’, অর্থাৎ ‘এ তো অন্ধকার’—এই দুইয়ের মিশ্রণে তৈরি বাক্যটির সরাসরি অর্থ খুব একটা স্পষ্ট নয়।
তবে গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষা সরঞ্জামের অভাবকে কেন্দ্র করে তরুণদের বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই বাক্যটি একধরনের প্রজন্মগত ব্যবধানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ব্যাপক সহিংসতারও জন্ম দেয়।
বাক্যটি কীভাবে সামনে এল
ধারণা করা হচ্ছে, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বাক্যটি প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম স্ন্যাপচ্যাটে। একজন ব্যক্তি শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাটরুমে ঢোকার চেষ্টা করতে গিয়ে এই বার্তা পাঠিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়।
স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারকারীদের উদ্দেশ করে বার্তাপ্রেরক লিখেছিলেন, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। ফ্রান্সের তরুণদের মধ্যে ব্যবহৃত আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্র কথ্যরীতিকে অনুকরণ করে বাক্যটি লেখা হয়েছিল বলে অনেকের ধারণা।
এরপর ওই লেখক যোগ করেন, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব।’
মামাদৌ ও আবদুল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি ব্যবহার করে তৈরি একাধিক প্রোফাইল থেকে একই ধরনের বার্তা কয়েকবার পাঠানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
স্ন্যাপচ্যাটের অন্য ব্যবহারকারীরা বাক্যটিকে হাস্যকর বলে মনে করেন। তাঁরা বার্তাগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে নিউইয়র্ক টাইমস এসব বার্তার মূল উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এরপর কী ঘটল
অনেক তরুণের সন্দেহ, এসব বার্তার পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা থাকতে পারেন। তাঁদের ধারণা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে কর্মকর্তারা তরুণদের ভাষা অনুকরণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ছিল বেশ আনাড়ি।
এরপর খুব দ্রুতই ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বাক্যটি আন্দোলনকারীদের কাছে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানে পরিণত হয়। তাঁদের মতে, আন্দোলন দমন বা নজরদারির চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ—এই ধারণাকে বিদ্রূপ করতেই স্লোগানটি ব্যবহার করা শুরু হয়।
এখন এই বাক্যকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্দোলনকারীদের, বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কৃষ্ণাঙ্গ এবং আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার রূপক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা পরিবারের সন্তান, কৃষ্ণাঙ্গ এবং আরব বংশোদ্ভূত বহু ফরাসি দীর্ঘদিন ধরেই কর্তৃপক্ষের বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তাঁদের একটি অংশ মনে করেন, এসব বার্তার মাধ্যমে পুলিশ আবারও আন্দোলনকারীদের একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের কোনো এজেন্ট ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বাক্যটি ব্যবহার করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে অনলাইনে ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করেন, যাতে বিক্ষোভে বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাকারীদের ওপর নজর রাখা যায়।
এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে তদন্তকারী কর্মকর্তার জন্য ছদ্মনাম ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, যাতে ‘অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যোগাযোগ শনাক্ত ও সংরক্ষণ করা যায় এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় সেগুলো প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।’
কেন এতটা সাড়া ফেলল স্লোগানটি
শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদের কাছে এই অদ্ভুত বাক্যটি তাঁদের আন্দোলন এবং সরকারের মধ্যে বিদ্যমান প্রজন্মগত ব্যবধানকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। আন্দোলনকারীদের অনেকের ধারণা, সরকার তাঁদের দাবিগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে না।
ফ্রান্সের প্রভাবশালী শিক্ষার্থী ইউনিয়নের মুখপাত্র সাবরিন খারবাচ বলেন, বাস্তবে কোনো তরুণ এভাবে কথা বলে না। তাঁর মতে, তরুণেরা বাক্যটিকে নিজেদের স্লোগানে পরিণত করেছেন এটা বোঝাতে যে তাঁদের আন্দোলনে নজরদারি বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা সহজে তাঁদের চোখ এড়িয়ে যায় না। এমন প্রচেষ্টা চললেও তাঁরা নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, স্ন্যাপচ্যাটের ওই বার্তাগুলো কর্তৃপক্ষের একধরনের ‘পূর্বসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাস’ তুলে ধরেছে। অর্থাৎ কারা ব্যারিকেড তৈরি করছে বা ‘সবকিছু ভেঙে ফেলার’ চেষ্টা করছে, সে সম্পর্কে যেন আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে রাখা হয়েছে।
প্যারিসের একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফেদ্রে কেমেন বলেন, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ এখন একধরনের জাতীয় কৌতুকে পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এর কারণ হলো, ‘এটি একজন তরুণের অত্যন্ত বাজে এক নকল রূপ।’
ফেদ্রে আরও বলেন, অনেকেই বাক্যটিকে বর্ণবাদের উদাহরণ হিসেবেও দেখছেন। কারণ, এ ধরনের ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে যেন ধরে নেওয়া হয়েছে, যারা সম্পত্তি ভাঙচুর করতে যাচ্ছে, তারা সবাই আরব।
ফ্রান্সের বাইরে যেভাবে ছড়িয়েছে
‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি শুধু ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বেলজিয়াম ও জার্মানিতে অনুষ্ঠিত অনুরূপ বিক্ষোভেও এটি ব্যবহার করা হয়েছে।
সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থী আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে বাক্যটি উচ্চারণ করেছেন। ভিডিওতে তিনি ‘জেন-জি’ প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে প্রচলিত আরও কিছু অঙ্গভঙ্গিও দেখান। এর মধ্যে ‘সিক্স-সেভেন’ সম্পর্কিত একটি অঙ্গভঙ্গিও ছিল, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
নতুন এই স্লোগানের ব্যবহার ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর ব্যঙ্গাত্মক ভাষার সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে। সেখানে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণ ও বেকার ভারতীয়দের ‘পরজীবী’ এবং ‘রুই-কাতলা/কাকরোচ’ বা তেলাপোকা বলে ব্যঙ্গ করার পর আন্দোলনকারীরা সেই শব্দকেই নিজেদের আন্দোলনের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
যেভাবে শুরু হয়েছিল বিক্ষোভ
গত মাসে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্কুলে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থী আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ ভবনের উন্নয়ন, শিক্ষকসংখ্যা বাড়ানো, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং কঠিন সময়সূচি শিথিল করা।
বেশির ভাগ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু কর্মসূচি সহিংস হয়ে ওঠে। অন্তত ২৪টি স্কুলে আগুন দেওয়া অথবা ভাঙচুর করা হয়। এসব সহিংসতার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সরকার প্রায় ৮ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।
পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন শ্রমিক ইউনিয়ন ও অন্যান্য সংগঠনের জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে একীভূত হয়। গত সপ্তাহান্তে সেটিই দেশব্যাপী বড় বিক্ষোভে রূপ নেয় এবং বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।
গত মাস থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ঘিরে পুলিশের বলপ্রয়োগের অন্তত ৩৪টি অভিযোগ তদন্ত করছে ফ্রান্সের সরকারি পর্যবেক্ষক সংস্থা। এসব ঘটনার মধ্যে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের ঘটনাও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কাছ থেকে এক পুলিশ কর্মকর্তা কাঁদানে গ্যাসের শেল ও গ্রেনেড ছুড়লে ওই কিশোর গুরুতর আহত হয় এবং পরবর্তী সময়ে পঙ্গু হয়ে যায়।

