ইউরোজোনের ব্যাংক খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশগুলোর সরকারি বন্ডের সুদহার বাড়ছে, আর একই সময়ে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা সরকারি বন্ডের পরিমাণও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ইউরোপীয় ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, ২০১০-এর দশকের ঋণসংকটের পর ইউরোজোনের ব্যাংকগুলোর সরকারি বন্ডে নিট বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়েছে।
গত জুন শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি ইউরো। এতে ১৫ বছর আগের সংকটের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা দেখা দিলেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, মূলধন ও তদারকির দিক থেকে ব্যাংকগুলো এবার তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে।
সুদহার বাড়লে সরকারি বন্ডের দাম কমে যায়। এতে বন্ডে বিনিয়োগ করা ব্যাংকগুলো চাপে পড়ে এবং ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ে। এর প্রভাব ইতিমধ্যে শেয়ারবাজারে দেখা গেছে। গত ছয় সপ্তাহে ইউরোপের ব্যাংক খাতের শেয়ারের দাম কমেছে ১০ শতাংশ, অথচ একই সময়ে সামগ্রিক বাজারের পতন হয়েছে এর এক-পঞ্চমাংশ। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে দর বেড়ে ব্যাংক খাতের শেয়ার ১৬ বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল। এই সময়ে ফ্রান্সের শীর্ষ তিন ব্যাংকের শেয়ারের দাম কমেছে ১৭ শতাংশ।
উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ফ্রান্স। দেশটির সরকারি ঋণের সুদহার ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বড় বাজেট ঘাটতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থী ও কট্টর বামপন্থী প্রার্থীরা এগিয়ে থাকায় দেশটির অর্থনৈতিক নীতি নিয়েও শঙ্কা বাড়ছে।
কী এই ‘ডুম লুপ’: ২০১০ সালে ইউরোজোনে তৈরি হওয়া ভঙ্গুর সরকারি অর্থব্যবস্থাকে ‘ডুম লুপ’ বলা হয়। এই চক্রে সরকারি ঋণের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বন্ডে বিনিয়োগ করা ব্যাংকগুলো লোকসানে পড়ে। কখনো কখনো ওই ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে সরকারকে অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে সরকারের ব্যয় ও ঋণের বোঝা আরও বাড়ে, আর্থিক অবস্থার অবনতি হয় এবং ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ ক্রমে বাড়তে থাকে। অর্থাৎ ব্যাংক ও সরকার একে অপরের দুর্বলতা বাড়িয়ে তোলে।
মুডিস রেটিংসের জ্যেষ্ঠ ব্যাংক বিশ্লেষক সাইমন আইনসওর্থ রয়টার্সকে বলেন, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি থেকে ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি আলাদা রাখা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলক ভালো অবস্থান থেকে সংকট মোকাবিলা করছে, তবে দেশের আর্থিক দুরবস্থার ঝুঁকি থেকে এই খাত মুক্ত নয়।
ইউরোপের ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারি বন্ড গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। নিয়ম অনুযায়ী এসব বন্ডকে ঝুঁকিমুক্ত সম্পদ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার সময় জামানত হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করা যায়। তাই বন্ডের দামের ওঠানামা সরাসরি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ নেওয়ার সামর্থ্যে প্রভাব ফেলে।
একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মূলধনও বেড়েছে। ফলে সম্ভাব্য লোকসান সামলানোর জন্য রাখা মূলধনের তুলনায় সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের অনুপাত কমেছে। ২০১৩ সালে এই অনুপাত ছিল ২.৭, এখন তা ২.৫-এর নিচে। অনুপাত কমার অর্থ, বন্ডের দাম কমলেও লোকসান সামাল দেওয়ার সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে।
ফ্রান্সের বড় ব্যাংকগুলোর অবস্থাও আগের সংকটের তুলনায় ভালো। অ্যাক্সিওম অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডেভিড বেনামু ও উইজডমট্রির শেয়ারবাজার কৌশলবিদ আনিকা গুপ্তার হিসাবে, বড় ফরাসি ব্যাংকগুলোর সর্বোচ্চ মানের মূলধনের প্রায় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ নিজ দেশের সরকারি ঋণে বিনিয়োগ করা আছে। ২০১১-১২ সালে ইতালির ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই অনুপাত ছিল ১০০ শতাংশের বেশি। এই তুলনা দেখায়, ব্যাংক ও সরকারের মধ্যে নির্ভরতা আগের মতো এত গভীর নয়।
বন্ডের দাম কমলে তাৎক্ষণিক লোকসান দেখানোর চাপ কমাতে ব্যাংকগুলো হিসাবের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোজোনের ব্যাংকগুলোর মোট সরকারি বন্ডের ৪১ শতাংশ ছিল নিজ দেশের বন্ড। ২০১৩ সালে এই হার ছিল ৫০ শতাংশের বেশি। ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বন্ডের ৬০ শতাংশ এখন ক্রয়মূল্য অনুযায়ী হিসাব করা হয়, যা আগের তুলনায় তিন গুণ।
যেসব বন্ড মেয়াদ পর্যন্ত ধরে রাখার জন্য কেনা হয়, সেগুলোর বাজারদর কমলেও নির্দিষ্ট শর্তে তাৎক্ষণিক লোকসান দেখাতে হয় না। তবে নগদ অর্থের প্রয়োজন হলে ব্যাংককে এসব বন্ড বিক্রি করতে হতে পারে। তখন লোকসান বাস্তব হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থাৎ হিসাবের খাতায় সমস্যা না দেখা গেলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।
মর্নিংস্টার ডিবিআরএসের বিশ্লেষক মারিয়া রিভাস বলেন, খাতায় লোকসান না দেখালেও বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের বন্ডের প্রকৃত অবস্থা কীভাবে দেখছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি সাময়িক হলে আস্থায় বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হলে ঝুঁকি নিয়ে তাঁদের ধারণা বদলে যেতে পারে।
সরকারি বন্ডের সুদহার বাড়লে ব্যাংকগুলোর নিজেদের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ে। কারণ আর্থিক বাজারে ঋণ নেওয়ার সময় ব্যাংককে সাধারণত সরকারি ঋণের সুদহারের চেয়ে বেশি সুদ দিতে হয়। পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়নের সময় এই খরচ বাড়লে মুনাফায় চাপ পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে পাইকারি ঋণবাজার থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেয় ফ্রান্সের ব্যাংকগুলো। ফলে সুদহার দীর্ঘদিন উঁচু থাকলে তাদের খরচ আরও বাড়বে।
তবে গ্রিসের পিরেয়াস ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টোস মেগালু মনে করেন, আগের সংকটের মতো বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি এখন কম। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকগুলো এখন সংকট মোকাবিলায় বেশি প্রস্তুত, আর ব্যাংকগুলো নিয়মিত ঝুঁকিও যাচাই করছে।
সব মিলিয়ে মূলধন ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও সরকারি ঋণের চাপ থেকে ইউরোজোনের ব্যাংকগুলো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বন্ডবাজারের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ঋণের খরচ বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে পারে এবং ব্যাংকের মুনাফায় চাপ তৈরি হবে। ফ্রান্সের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটে কি না এবং সুদহার কত দিন উঁচু থাকে, তার ওপরই নির্ভর করছে বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক থাকবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নেবে।

