১৯৬২ সালের ১৪ থেকে ২৮ অক্টোবর পারমাণবিক যুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের উপকূল থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে কিউবায় গোপনে সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর খবর ফাঁস হওয়ার পর দুই পরাশক্তির মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তাকে সেই সময়ের একটি বিবিসি অনুষ্ঠানে ‘মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সপ্তাহ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ও তাঁর ভাই রবার্ট কেনেডির সংযম ও কূটনৈতিক দক্ষতায় সংঘাত এড়ানো যায়। বিবিসির প্রতিবেদনে সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে, হোয়াইট হাউসের ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল এবং এক অদ্ভুত ভুল বোঝাবুঝি কীভাবে সোভিয়েত নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল।

সংকটের সূচনা হয়েছিল ১৯৬২ সালের গ্রীষ্মে। পর্যটক ও কৃষি বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে চল্লিশ হাজারের বেশি সোভিয়েত সেনা, প্রকৌশলী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ কিউবার রাজধানী হাভানায় যান। তাঁদের এই ভ্রমণের আড়ালেই দ্বীপটিতে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর কাজ চলছিল। ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা বিমান ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত করে। তখন সিআইএর ছবি বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ছিলেন আর্থার লুন্ডাল। ১৯৯২ সালে বিবিসির টাইমওয়াচ অনুষ্ঠানে তিনি সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করেন। ছবি দেখার পর সহকর্মীদের তিনি বলেছিলেন, তিনি জানেন তাঁরা কী ভাবছেন, কারণ তিনিও একই কথা ভাবছেন যে তাঁরা সোভিয়েত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান দেখছেন।
কিউবায় সোভিয়েত তৎপরতা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ অবশ্য আগে থেকেই ছিল। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারা বিবিসিকে জানান, ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর খবর নিয়ে সামরিক বাহিনী প্রায় পাঁচ হাজার তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই ভুল বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, মার্কিন কর্মকর্তারা ভাবতেই পারেননি যে সোভিয়েত নেতারা এত বড় ঝুঁকি নেবেন, কারণ এতে তাঁদের লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই ছিল অনেক বেশি।
ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পরও কেনেডি বিষয়টি প্রকাশ করেননি। ১৮ অক্টোবর হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে তাঁর সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে বসেন সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো। সেই বৈঠকে গ্রোমিকোর দোভাষী ছিলেন ভিক্টর সুখোদরেভ। ২০০২ সালে বিবিসিকে তিনি বলেন, পরিবেশ ছিল ভদ্রোচিত, কিন্তু কোনোভাবেই বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। কেনেডিকে কিছুটা উত্তেজিত মনে হচ্ছিল। বিবিসির সাবেক মস্কো প্রতিনিধি অ্যালান লিটলের ভাষ্য, দুজনেই জানতেন কিউবায় সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র আছে, কিন্তু কেউই নিজের অবস্থান প্রকাশ করেননি। পুরো অঞ্চলের মানুষের জীবন বাজি রেখে চলছিল এক ধরনের কূটনৈতিক চালের খেলা।
কেনেডির কাছে ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি ছিল এবং সেগুলো রাখা ছিল বৈঠকের টেবিলের একটি ড্রয়ারে। সুখোদরেভ জানান, কেনেডি ড্রয়ারটি একবারও খোলেননি। ছবি দেখালে গ্রোমিকো কী বলতেন, তা আর কখনো জানা যাবে না। তবে সরাসরি প্রশ্ন না করায় গ্রোমিকোকে মিথ্যা বলতেও হয়নি। এর বদলে কেনেডি ৪ সেপ্টেম্বরের নিজের একটি বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেন, যেখানে তিনি সতর্ক করেছিলেন যে কিউবায় আক্রমণাত্মক অস্ত্র বসানো হলে তার পরিণতি গুরুতর হবে। গ্রোমিকো দাবি করেন, কিউবাকে দেওয়া সহায়তা সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়।
ততদিনে কেনেডি ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের নিয়ে ‘এক্সকম’ নামে একটি কমিটি গঠন করে ফেলেছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। কমিটির বৈঠকের গোপন রেকর্ডিংয়ে দেখা যায়, সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল। কেনেডি বলেছিলেন, বিপদের শুরু ক্রুশ্চেভই করেছেন, ঝুঁকি নিয়ে তিনিই খেলছেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়। বৈঠকে এক কর্মকর্তা বলেন, কিউবাকে কেন্দ্র করে ক্রুশ্চেভ পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেবেন, তা তাঁরা কখনো ভাবেননি।
ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে থাকায় করণীয় নিয়ে ওয়াশিংটনে মতভেদ দেখা দেয়। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও হামলার পক্ষে ছিলেন। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন রাস্ক ১৯৯২ সালে বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। কেনেডি একটি বৈঠকে কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, ‘ভদ্রমহোদয়রা, আজ আমাদের দায়িত্বের প্রতিদান দেওয়ার দিন।’ প্রথমে বিমান হামলা চালিয়ে পরে কিউবা আক্রমণের পরিকল্পনা তিনি নাকচ করে দেন, কারণ তাঁর আশঙ্কা ছিল এতে সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে। এর বদলে তিনি কিউবায় পাঠানো আক্রমণাত্মক সামরিক সরঞ্জামের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করেন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো ভেঙে ফেলার দাবি জানান।
ক্রুশ্চেভের পিছু হটার পেছনে আরেকটি ঘটনা কাজ করেছিল, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সামনে আসে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন ওয়াশিংটনে সোভিয়েত সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিনিধি পরিচয়ে কাজ করছিলেন কেজিবি এজেন্ট আনাতোলি গোরস্কি। এক রাতে তিনি ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে পানাহার করতে যান। বার বন্ধ হওয়ার সময় রুশ বংশোদ্ভূত বারটেন্ডার জনি প্রোকফ তাঁকে জানান, কয়েক ঘণ্টা আগে নিউইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউনের দুই সাংবাদিক ওয়ারেন রজার্স ও রবার্ট ডোনোভানের কথোপকথন তিনি শুনেছেন। প্রোকফের ভাষ্য অনুযায়ী, ডোনোভান সেই রাতেই মায়ামি যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, যেখানে কিউবা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে একদল সাংবাদিকের যোগ দেওয়ার কথা ছিল।
গোরস্কি দ্রুত দূতাবাসে ফিরে মস্কোকে জানান, কিউবায় মার্কিন আক্রমণ আসন্ন। পরে অবশ্য জানা যায়, সাংবাদিকেরা আসলে সম্ভাব্য হামলা হলে কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ করবেন, তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। হামলার কোনো নিশ্চিত পরিকল্পনার কথা তাঁরা বলেননি এবং প্রোকফ কথোপকথনটি ভুল শুনেছিলেন। তিনি কেজিবির এজেন্ট ছিলেন, এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বিবিসি। তবু গোরস্কির বার্তা ক্রুশ্চেভের কাছে পৌঁছে যায়। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ওলেগ ত্রোয়ানভস্কি পরে জানান, বার্তা পেয়ে ক্রুশ্চেভ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তিন দিন মুখোমুখি অবস্থানের পর শেষ পর্যন্ত তিনি পিছু হটেন এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে রাজি হন।
সংকটের সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, কেনেডি ইচ্ছা করেই সময় নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত লর্ড হারলেক ১৯৬৯ সালে বিবিসিকে বলেন, পরিস্থিতি দক্ষতা ও সতর্কতার সঙ্গে সামাল দেওয়া না গেলে তা পারমাণবিক যুদ্ধে গড়াতে পারত। কেনেডি ভাইদের ব্যক্তিগত বন্ধু হারলেকের মতে, ক্রুশ্চেভকে সিদ্ধান্ত বদলের সময় দেওয়া জরুরি ছিল। কারণ ক্ষেপণাস্ত্র সরাতে হলে তাঁকে নিজের দেশের নেতৃত্ব, মিত্র দেশগুলো এবং কিউবার সঙ্গে সম্পর্কও সামলাতে হতো। কেনেডি ভাইয়েরা তা বুঝেছিলেন এবং তাঁকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান বিবিসিকে বলেন, কেনেডি ভাইদের মধ্যে একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়কের প্রয়োজনীয় গুণ ছিল। তাঁর মতে, প্রথমত রাষ্ট্রনায়ককে প্রতিপক্ষের অবস্থান বুঝতে হয়, কীভাবে তিনি এমন পরিস্থিতিতে পড়লেন এবং কীভাবে সেখান থেকে বেরোতে পারেন, তা বিবেচনা করতে হয়। দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হয়, তবে সেই ভয় যেন সিদ্ধান্তের পথে বাধা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়। ম্যাকমিলান বলেন, প্রতিপক্ষকে বোঝার পাশাপাশি নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকাও জরুরি, আর কেনেডি ভাইয়েরা এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, যাঁরা সংকটটি সামলেছিলেন, তাঁরা ঠিক পথেই এগিয়েছিলেন।
ছয় দশকের বেশি পরও কিউবা সংকটের শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। দুই পক্ষ যখন পরস্পরের অভিপ্রায় সম্পর্কে অনিশ্চিত, তখন একটি ভুল শোনা কথাও বড় সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। সামরিক হামলার চাপের মুখে সংযম দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে সম্মানজনকভাবে পিছু হটার সুযোগ দেওয়াই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে পরমাণু যুদ্ধের কিনারা থেকে ফিরিয়ে এনেছিল।

