চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯ জনই বিদেশি নাগরিক, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশ। জার্মানির বার্লিনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।
সংস্থাটির মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এবারও সৌদি আরব বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে শীর্ষে এবং বৈশ্বিকভাবে এই শাস্তি বাড়ার পেছনে দেশটির বড় ভূমিকা রয়েছে। সম্প্রতি মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হয়েছে। তবে তাঁরা ছয় মাসের এই হিসাবের বাইরে। ওই সময়ে কত বাংলাদেশির সাজা কার্যকর হয়েছে, তা জানা যায়নি।
সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসে সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ৪৯টি, যা মোট সাজার ৪৬ শতাংশ। দণ্ডিতদের মধ্যে সৌদি আরব ছাড়াও ১৭টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। এর মধ্যে আছে বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তান। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে চলতি বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে, যা আগের যেকোনো শাসনামলের তুলনায় রেকর্ড।
অপরাধের ধরনে মাদক মামলার আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। ১০৮টির মধ্যে ৭১টি, অর্থাৎ প্রায় ৬৬ শতাংশ মৃত্যুদণ্ড মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে, যা মোট সাজার ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এ অপরাধে দণ্ডিতদের মধ্যে ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিক সবচেয়ে বেশি ছিলেন। হত্যা মামলায় কার্যকর হয়েছে ২৫টি, যা ২৩ শতাংশ। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় ৯টি (৮ শতাংশ) এবং অন্যান্য মামলায় ৩টি (৩ শতাংশ) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ১০৮টির মধ্যে ৮৩টি, অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ এমন অপরাধের জন্য, যার সঙ্গে হত্যার সম্পর্ক ছিল না। এ ছাড়া ৮৪টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বিচারকের একক বিবেচনামূলক ক্ষমতায় দেওয়া ‘তাজির’ শাস্তির ভিত্তিতে, যা মোট সাজার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
স্বচ্ছতার ঘাটতিও উদ্বেগের বড় কারণ। ১০৮টি মামলার মধ্যে ৯১টির ক্ষেত্রে, অর্থাৎ ৮৪ দশমিক ২ শতাংশের বিষয়ে সাজা কার্যকরের আগে ইএসওএইচআর বা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোনো তথ্য জানতে বা নথিবদ্ধ করতে পারেনি।
রাজনৈতিক মামলায়ও কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। গত জুনে সৌদ আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। জাতিসংঘের আটকাদেশবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ আগেই তাঁর আটকাদেশকে বেআইনি ও অযৌক্তিক বলেছিল। ৯ এপ্রিল আলী আল-সুবাইতি নামের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের একটি ছিল ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া।
সংস্থাটি বলছে, শৈশবে করা কথিত অপরাধের জন্য এখনো অন্তত পাঁচজন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ তাঁদের কয়েকজনের আটকাদেশকে বেআইনি ঘোষণা করে মুক্তির আহ্বান জানালেও সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশের অভিযোগে দণ্ডিত আরও ৪৯ জন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন। তাঁদের মধ্যে শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকিও রয়েছেন। ২০১৮ সাল থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে এলেও বিচার এখনো অমীমাংসিত।
কারাগারগুলোতেও বিপুলসংখ্যক মানুষ মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে বন্দী আছেন। খামিস মুশাইত কারাগারে ৫৮ ইথিওপীয়, নাজরান কারাগারে পাঁচ ইথিওপীয় ও পাঁচ সোমালীয় এবং তাবুক কারাগারে আটজন মিসরীয় রয়েছেন। সংস্থার নথিবদ্ধ তথ্যে এসব বন্দীর মামলায় পেশাদার দোভাষীর অনুপস্থিতি, আইনি সহায়তা না পাওয়া, বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে না পারা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ না পাওয়ার মতো লঙ্ঘনের কথা উঠে এসেছে। বন্দীরা জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্কে থাকেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ‘ডেথ রো’-এর বন্দীদের অল্প কিছুদিন সম্পূর্ণ আলাদা রেখে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও তাঁরা জানান।
ইএসওএইচআরের মূল্যায়ন, ছয় মাসের চিত্র নিশ্চিত করে যে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা ও প্রকাশ্যে দেওয়া আইনি প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা না করেই দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছে। এর মধ্যে নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন ও শিশু অধিকার সনদের অধীনে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও আছে।
এই পরিসংখ্যান বিদেশি শ্রমিকদের ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট করে। মোট সাজার অর্ধেকের বেশি বিদেশির বিরুদ্ধে কার্যকর হওয়া এবং ভাষা ও আইনি সহায়তার ঘাটতির অভিযোগ বাংলাদেশসহ শ্রমিক পাঠানো দেশগুলোর জন্য কূটনৈতিক সহায়তা ও আইনি সুরক্ষা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনছে। তবে সংস্থার অধিকাংশ তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতার অভাবের কারণে নিজস্ব নথিভুক্তির ওপর নির্ভরশীল, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

